Wednesday, December 15, 2010

হায় হায় কম্পানি by মোস্তফা কামাল

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে নাদের আলী চাকরির জন্য দরখাস্ত করে। সঙ্গে জামানতের তিন হাজার টাকার ব্যাংক ড্রাফট পাঠায়। এ জন্য তাকে ধারদেনা করতে হয়। সে ভাবে, চাকরি হলে তিন হাজার টাকা শোধ করা কোনো ব্যাপার হবে না!

একটি বেসরকারি সংস্থায় প্রশাসনিক কর্মকর্তার পদে চাকরির আশায় নাদের আলী প্রতিবেশীর কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ব্যাংক ড্রাফট করে পাঠায় ঢাকায়। এমনিতেই চাকরির বাজার মন্দা, ডিগ্রি পাস করে গ্রামে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে চাকরিটা যদি পাওয়া যায়, মন্দ কী! মা-বাবার সংসারে কিছুটা সহায়তা তো করা যাবে!
চাকরি হওয়ার খবর নেই, ইন্টারভিউ কার্ড পেয়েই নাদের আলী খুশি। বিগত তিন বছরে সে কম দরখাস্ত করেনি। কোনো দিন ইন্টারভিউ কার্ডও পায়নি। আজ কার্ড পেয়ে সে মাকে দেখায়, বাবাকে দেখায়। পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে এমনভাবে বলে, যেন তার চাকরি হয়ে গেছে।
ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য ঢাকায় রওনা হয় নাদের আলী। এত বড় শহরে এসে খেই হারিয়ে ফেলে। ঠিকানা হাতে নিয়ে এর-ওর কাছে জিজ্ঞাসা করে। কিন্তু সেই ঠিকানায় কাউকে খুঁজে পায় না। কেউ বলতেও পারে না। এখন কোথায় যাবে, কী করবেÑকিছুই ভেবে পায় না নাদের আলী। সে চুল ছেঁড়ে আর বলে, এ তো দেখছি হায় হায় কম্পানির পাল্লায় পড়লাম! দেনা করে ব্যাংক ড্রাফট করলাম। এখন শোধ দেব কী দিয়ে! মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে সে।
নাদের আলী ঢাকার ফুটপাত দিয়ে হাঁটে আর ভাবে, ঢাকায় থাকার কোনো জায়গা নেই, বাড়িতে যাওয়ার উপায় নেইÑএখন কী করি! সে পথচারী হাবলু মিয়াকে বলে, ভাই, আমাকে একটা বুদ্ধি দেবেন?
হাবলু মিয়া বলল, জি না।
কেন?
ফি লাগবে।
কত টাকা?
দুপুরের খাওয়ার পয়সা দিলেই হবে।
ও, আপনার অবস্থাও তো আমার মতো!
মানে!
আমি হায় হায় কম্পানির পাল্লায় পড়ে দেউলিয়া হয়েছি। এখন টাকা-পয়সা হাতে নেই। ঢাকায় থাকার ব্যবস্থা নেই।
তাই নাকি! আরে ভাই আগে বলবেন না! আমারও তো একই অবস্থা। পত্রিকায় সত্যি সত্যি হায় হায় কম্পানির নামে একটি বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, শর্ত সাপেক্ষে লোক নিয়োগ করা হবে। তবে চাকরিপ্রার্থীদের অবশ্যই পাঁচ হাজার টাকার ব্যাংক ড্রাফট পাঠাতে হবে। ওই টাকা সিকিউরিটি মানি হিসেবে জমা থাকবে। চাকরি না হলে পুরো টাকা ফেরত দেওয়া হবে। আমি সরল বিশ্বাসে পাঁচ হাজার টাকার ব্যাংক ড্রাফট পাঠাই। এসে দেখি, হায় হায় কম্পানির একটি সাইনবোর্ড আছে, কিন্তু কোনো লোক নেই।
কী বলেন! কম্পানির নামই হায় হায় কম্পানি?
হ্যাঁ ভাই, হ্যাঁ!
তাহলে তো ঠিকই আছে।
কী ঠিক আছে?
তারা নিজেদের হায় হায় কম্পানি ঘোষণা করেই আপনার টাকা নিয়েছে। এতে তাদের কোনো দোষ নেই।
কী বললেন! আচ্ছা ভাই, হায় হায় কম্পানি মানে কী?
মানে ভুয়া কম্পানি।
তাই! আমি এত বোকা!
আপনার নামই তো হাবলু! বুদ্ধিমান হওয়ার সুযোগ কোথায়! আপনি আবার আমাকে বুদ্ধি দিতে চান!
হাবলু মিয়া হাবাগোবার মতো নাদের আলীর দিকে তাকিয়ে থাকে। নাদের আলী আর দাঁড়ায় না। সে আপন মনে হাঁটতে থাকে।

২.
হাঁটতে হাঁটতে নাদের আলী তাবানী বেভারেজের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বিশাল গেটের সামনে এক জায়গায় লেখা আছে, ‘অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ’। আরেক জায়গায় লেখা আছে, ‘লোক নিয়োগ চলছে’।
নাদের আলী খুব ভালো করে লেখা দুটি পড়ে। তারপর গেটে দাঁড়ানো এক লোককে বলে, একটা কথা জিজ্ঞাসা করব?
জি, করেন।
আবার ফি দিতে হবে না তো!
কিসের ফি?
কথা বলার ফি।
এই মিয়া, ইয়ার্কি করেন!
না ভাই, ইয়ার্কি করছি না। এক লোক বুদ্ধি দেওয়ার জন্য ফি চাইল তো, তাই বললাম! সরি ভাই, মনে কিছু করবেন না।
ঠিক আছে, করব না। এবার আপনার প্রশ্নটা করেন।
এই যে গেটের এক পাশে লেখা কারখানাটি বন্ধ, আরেক পাশে লেখা লোক নিয়োগ চলছেÑঘটনা কী!
ঘটনা আছে। আপনি চাকরি করবেন?
চাকরির জন্যই তো ঢাকায় এসেছি!
চাকরি পেতে হলে ঘুষ লাগবে!
ঘুষ! এটা আবার কী?
ঘুষ মানে জানেন না? টাকা লাগবে, টাকা! টাকা দিলে চাকরি হবে।
হ্যাঁ, খুব ভালো বলেছেন, আমি টাকা দিই, আর আপনি টাকা নিয়ে ভাগেন! দরকার নেই আমার চাকরির। আমি যাই।
নাদের আলী হাঁটে আর মনে মনে বলে, কী ব্যাপার, ঢাকা শহরে কি সবই হায় হায় কম্পানি!
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক

বিদ্যুৎ উৎপাদনে শর্ত

বিদ্যুতের ব্যাপক চাহিদা মেটাতে প্রতিশ্রুতি পূরণের লক্ষ্যে সরকার একের পর এক উদ্যোগ গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে খুলনায় এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে মেঘনাঘাট ও কেরানীগঞ্জেও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এসব উদ্যোগের শুরুতেই আবার জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কিছু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোনোটির আবার ব্যবহার্য কাঁচামাল নিয়েও কথা উঠেছে। বিশেষ করে খুলনায় প্রস্তাবিত কেন্দ্র দুটির অংশীদার প্রতিষ্ঠান ভারতের ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কম্পানি যেসব শর্ত জুড়ে দিয়েছে বলে পত্রিকার সংবাদে জানা গেছে, তাতে মনে হয় আরেকটি কাফকো বিতর্ক তৈরির সুযোগ আসছে সামনে।

বাংলাদেশের জন্য এবং বাংলাদেশের অংশীদারে নির্মিত হবে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র, অথচ এর একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে। এমন শর্ত যে খসড়া চুক্তিতে স্থান পেয়েছে, তাকে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষাকারী হিসেবে বর্ণনা করা যায় কি? শুধু তা-ই নয়, এ খসড়া চুক্তিতে কর সুবিধা, পরবর্তীকালে দেশের ভেতরে বিদ্যুৎ বিক্রির ব্যাপারেও তাদের যে শর্ত তাকেও সহজ এবং দেশের স্বার্থের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় বলে মনে হয়। যেহেতু অংশীদারির ভিত্তিতে এ প্রকল্প কাজ করবে তাই ভারতের স্বার্থ একচেটিয়া হওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। সাধারণ শ্রমিক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কর্মীর কথা বিবেচনা করলেও দেখা যাবে, বাংলাদেশে তেমন জনশক্তি আছে। কিন্তু সেই খসড়া চুক্তিতে এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে, যাতে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট জনবলের প্রায় সবাই আসবে ভারত থেকে। চুক্তি সম্পাদনের জন্য যে স্ট্যাম্প লাগবে তা-ও বাংলাদেশকে দিতে হবে_এমন শর্তসহ চুক্তিপত্রটি নিয়ে আরো ভাবা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন অতি জরুরি বিষয় হলেও দেশের স্বার্থ অগ্রাহ্য করে কোনো কাজ করা হলে তা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, মেয়াদকালে বাংলাদেশ সরকার নীতি-কৌশলের দিক থেকে প্রতিবন্ধক হতে পারবে না। খসড়া চুক্তিটি যাচাই করার সময় দেশের স্বার্থকে অবশ্যই উচ্চে স্থান দিতে হবে।
এদিকে কেরানীগঞ্জ ও মেঘনাঘাটে প্রস্তাবিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে গ্যাস ব্যবহারের যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে তাও অবাস্তব বলে বিশেষজ্ঞরা ইতিমধ্যে মত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁদের যুক্তি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কারণ নতুন গ্যাস প্রাপ্তির কোনো নিশ্চয়তা না পেয়ে সরকার যদি গ্যাসনির্ভর কোনো প্রকল্প গ্রহণ করে তাহলে এটি ব্যর্থ হওয়ার আশঙ্কাই প্রকট। আবার কেরানীগঞ্জের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র নির্মাণ করাও সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। দেশের সম্পদ ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হলে উৎপাদন ব্যয় কমে আসার পাশাপাশি উৎপাদন ক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কাও কমে আসবে। এ মুহূর্তে দেশের কয়লা উৎপাদন বাড়িয়ে তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করা সবচেয়ে যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি।

কানকুন জলবায়ু সম্মেলনঃ স্বল্পমেয়াদি সাফল্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই

মেক্সিকোর কানকুনে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলনে সাফল্য সামান্যই। কোপেনহেগেনের বহুল আলোচিত সম্মেলন ব্যর্থ হওয়ার পর এবারের সম্মেলন কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হলে এ ধরনের বহুপক্ষীয় আলোচনা ভবিষ্যতে আদৌ রাষ্ট্রগুলোর কাছে কোনো আবেদন সৃষ্টি করতে পারত কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। এ সম্মেলনের মাধ্যমে তা অনেকটাই কাটানো গেছে।

তবে জলবায়ু আলোচনার বেশ কিছু মুখ্য প্রশ্ন এবারও পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলো। একটি ন্যায্য ও আইনগত বাধ্যবাধকতার চুক্তি করা যায়নি। অন্যদিকে কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ বাড়ানো নিয়েও কোনো সমঝোতা হয়নি। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে আগামী সম্মেলন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। অথচ কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে ২০১২ সালে। এটির পরের পর্যায় শুরু করার ব্যাপারে সম্মত হতে কয়েক বছর লেগে যাবে। এই শূন্যতা কীভাবে পূরণ হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকেই যাচ্ছে। এই সমঝোতায় ২০৫০ সাল নাগাদ কার্বন নিঃসরণের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও অনুপস্থিত। তা ছাড়া শিল্প খাতভিত্তিক কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। ফলে আরও এক বছর তারা অনিয়ন্ত্রিতভাবে দূষণ ঘটিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেল।
কানকুন সমঝোতায় শিল্পবিপ্লবপূর্ব সময়ের সাপেক্ষে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি দুই ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখার ব্যাপারে অঙ্গীকার করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এ দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জন জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব এড়ানোর জন্য অপরিহার্য। তাই এ অঙ্গীকার ইতিবাচক। যদিও এই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে কোনো দেশ আইনগতভাবে বাধ্য নয়। গত কোপেনহেগেন সম্মেলনেও বহু অঙ্গীকারের কথা শোনা গেছে, কিন্তু বাস্তব অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
অন্যদিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব মোকাবিলায় গরিব দেশগুলোকে তহবিল প্রদানের ব্যাপারেও মতৈক্যে পৌঁছা গেছে। কোপেনহেগেন সম্মেলনেও ঝুঁকির মধ্যে থাকা দরিদ্র দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তহবিল প্রদানের মুলো ঝুলিয়ে একধরনের আশাবাদ সৃষ্টি করা হয়েছিল। এবারের সম্মেলনেও তার ছায়া অপসৃত হয়নি। আমাদের জলবায়ু কূটনীতিকে আরও সক্রিয় করা প্রয়োজন। মূলত শিল্পোন্নত ও সাম্প্রতিক কালে বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির দেশগুলোর কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। তাই ক্ষতিপূরণের দাবি ন্যায্য। অভিযোজনও বিরূপতা কাঠানোর কৌশল। জলবায়ু পরিবর্তন যে ভয়ানক বিপদ হাজির করে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরই জোর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য বাংলাদেশের দিক থেকে ন্যায্য তহবিল পাওয়ার চেষ্টা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নেওয়া।

ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে শ্রমিকবান্ধব সিদ্ধান্ত নিনঃ অনাকাঙ্ক্ষিত শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনা

তৈরি পোশাক কারখানায় মজুরির সমস্যাকে কেন্দ্র করে শ্রমিক বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে এ পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু এবং শতাধিক আহত হওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রামে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিকের সংখ্যা এবং পুলিশ-র্যাবের ৫০০ গুলি ও প্রায় শতটি টিয়ার শেল নিক্ষেপ থেকে সংঘর্ষের ব্যাপকতা অনুমান করা যায়। এই মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কী কারণে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো, তার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। পাশাপাশি কী কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেল, তাও সঠিকভাবে চিহ্নিত হতে হবে।

গত জুলাই মাসে সরকার, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত ত্রিপক্ষীয় কমিটির মাধ্যমে পোশাকশিল্পে নতুন ন্যূনতম জাতীয় মজুরিকাঠামো ঘোষিত হয়। প্রথমত, আশানুরূপ না হওয়ায় শ্রমিকদের বড় অংশই এটা মানতে রাজি ছিল না। দ্বিতীয়ত, সেই মজুরিও চার মাস পর অর্থাৎ গত নভেম্বর থেকে দেওয়ার ঘোষণায় তাঁরা আরও হতাশ হন। এর মধ্যে দুটি ঈদেও তাঁরা কাঙ্ক্ষিত বোনাসও পাননি। তার পরও শ্রমিকেরা ডিসেম্বর মাসের জন্য দিন গুনেছেন। কিন্তু ডিসেম্বরের শুরুতেই নভেম্বরের বেতন হাতে পেয়ে তাঁদের একাংশের হতাশা চরমে ওঠে। তাঁদের অভিযোগ, নতুন শ্রমিকদের বেতন কিছুটা বাড়লেও পুরোনো ও দক্ষ শ্রমিকদের বেতন সেই অনুপাতে বাড়েনি। অনেক ক্ষেত্রেই তা নতুন শ্রমিকদের থেকেও কম হয়ে গেছে। এর জের ধরেই গত শনিবার চট্টগ্রাম ইপিজেডের ১৬টি কারখানা এবং ঢাকা বিভাগের ১১টি কারখানা বিশৃঙ্খলা ও ভাঙচুরের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে। গত রোববার রাজধানীর কুড়িলে শ্রমিকেরা বিক্ষোভ ও ভাঙচুর করেন। একই দিনে চট্টগ্রাম ইপিজেডে শ্রমিকেরা কাজে যোগদান করতে গেলে ফিরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে এবং নির্ধারিত বৈঠক না হওয়ার প্রতিবাদে আবারও বিক্ষোভ শুরু হয়। বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের পেছনেও এ কারণটিই প্রধান। তিনটি প্রাণের দুঃখজনক মৃত্যু এবং অনাকাঙ্ক্ষিত ভাঙচুরের পটভূমিও এটি।
পোশাকশিল্পের মজুরি-সমস্যা দুরারোগ্য ব্যাধির মতোই সবাইকে ভুগিয়ে চলছে। শিল্পটির জন্মের পর থেকেই এ কারণে বিক্ষোভ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন অনেক শ্রমিক, ঘটেছে অজস্র ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা। আশা করা হয়েছিল, নতন মজুরিকাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে এর নিরসন ঘটবে। কিন্তু মালিকদের চুক্তি ভঙ্গ করা এবং শ্রমিক ঠকানোর প্রবণতার জন্যই সরকারি চেষ্টা সত্ত্বেও শ্রমিকাঞ্চলে শান্তি আসছে না।
মালিকদের নতুন মজুরিকাঠামো মানতে বাধ্য করার দায়িত্ব বিজিএমইএ ও সরকারের। পোশাক খাত দেশের অর্থনীতিতে তো বটেই, মালিকদের অর্থ-বিত্তকেও বিপুলভাবে বৃদ্ধি করেছে। এই সাফল্যের অংশীদার শ্রমিকেরাও। পোশাকশিল্পের প্রবৃদ্ধির হার এ বছর ৩৮ শতাংশ। এত অনুকূল অবস্থা থাকা সত্ত্বেও লাভের ভাগ মালিকের, দুর্ভোগের দায় শ্রমিকের—এটা চলতে পারে না।
চট্টগ্রামে শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন। এ মুহূর্তে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং শিল্পমালিকদের যেকোনো বাড়াবাড়ি মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। একই সঙ্গে শ্রমিকনেতাদের বুঝতে হবে, গঠনমূলক আন্দোলনই দীর্ঘ মেয়াদে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, নৈরাজ্য নয়। জরুরি ভিত্তিতে ত্রিপক্ষীয় কমিটির বৈঠক হওয়া দরকার। সেখানে সরকারের দায়িত্ব বিজিএমইএকে দিয়ে নতুন মজুরিকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও শ্রমিক অসন্তোষের ইতি ঘটানো।

স্বাধীন বাংলাদেশ পরাধীন মুক্তিযোদ্ধা by এম আর আলম

আগের দিনই খবরটা পৌঁছে যায় দিনাজপুর শহরে। সর্বত্র আতঙ্ক। ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুরের মধ্যেই দিনাজপুর আক্রমণ। পাকিস্তানি বাহিনী একটা বিশেষ ট্রেনে চেপে সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে রওনা দিয়েছে। এ খবর ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দাদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় পশ্চিম দিনাজপুর জেলার বরাহার মুক্তিযোদ্ধা অপারেশন ক্যাম্পে। খবরটা শুনে ছটফট করতে থাকেন মাসুম হাসান তোরাব আলী। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর থানার বড় হাশিমপুর গ্রামে। পাকিস্তানি বাহিনীর হামলায় দিনাজপুরের হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি মারা যাবে, এ উৎকণ্ঠা তোরাবের মনে ভর করে। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে যান। যে করেই হোক বাঁচাতে হবে নিজ এলাকার মানুষকে, স্বজন-বন্ধুদের।

তোরাব ক্যাম্পের কমান্ডার ডা. আমজাদ হোসেনের সামনে ঘুর ঘুর করতে থাকেন। কমান্ডার বুঝে যান তোরাবের মনোভাব। আর সঙ্গে সঙ্গেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয় অপারেশনের।
চিরিরবন্দর রেলওয়ে স্টেশনের অদূরে জগদীশপুর রেলসেতুটি উড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে তোরাবের ওপর। মাত্র ছয় সদস্যের মুক্তিবাহিনী নিয়ে অপারেশনে বেরিয়ে পড়েন তোরাব।
ভারতের বরাহার ক্যাম্প থেকে মেশিনগান, কয়েকটি রাইফেল নিয়ে বের হয় তোরাবের বাহিনী। আরও নেওয়া হয় স্থলমাইন। যে মাইনটি পোঁতা হবে ব্রিজের পাটাতনের (স্লিপার) নিচে। দীর্ঘ ৪০ মাইল পথ হেঁটে ছুটলেন তাঁরা।
২৯ সেপ্টেম্বর রাত তিনটার দিকে পৌঁছে যান সেতুর খুব কাছাকাছি। এর আগে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টার পথ চলার ক্লান্তিতে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর শক্তিটুকু যেন ছিল না তাঁদের।
ক্লান্ত তোরাবের চোখে স্বপ্ন উঁকি দেয়, দেশটা স্বাধীন হয়েছে। আকাশের বুকে মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ পতাকাটি উড়ছে পতপত করে।
দূরে ট্রেনের শব্দ শোনা যায়। সংবিত ফেরে তোরাবের। আর দেরি করা যায় না। তড়িঘড়ি কাপড়ের পুঁটলি থেকে বের করেন মাইনটি। এরপর ছয় যোদ্ধা ক্রলিং করে এগিয়ে যান সেতুর কাছে। তোরাবের হাতে মাইনটি। সব ঠিক, কেবল সেতুর পাটাতনের নিচে মাটি আলগা করে পোঁতা হবে সেই মাইন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ ঘটে। আর কিছু মনে নেই তোরাবের! যখন জ্ঞান ফিরল তখন নিজেকে আবিষ্কার করলেন শিলিগুড়ির বাগডোকরা হাসপাতালে। সহযোদ্ধারা আহত তোরাবকে কাঁধে করে প্রথমে নিয়ে আসেন ক্যাম্পে। পরে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর অ্যাম্বুলেন্সে নেওয়া হয় হাসপাতালে। ডান হাতের কবজি পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হয়েছে, ডান চোখটিও নেই তাঁর। চিকিৎসকেরা আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। তবে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে বাঁচাতে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ চেষ্টার কোনো ত্রুটি করেনি। তোরাবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয় বোম্বের সামরিক হাসপাতাল ও পুনাতে। সেখানে কৃত্রিম চোখ লাগানো হয় তাঁর।
বাংলাদেশ স্বাধীন। তবু তোরাব ঘরে ফিরছেন না। তোরাবের বাবা গহির উদ্দিন ছেলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন। সুস্থ হয়ে তোরাব ১৯৭২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঘরে ফেরেন। মুক্তিযোদ্ধার সেই রেলসেতু অপারেশন কিন্তু বৃথা যায়নি। পরে জেনেছিলেন, মাইন বিস্ফোরণের ঘটনায় পাকিস্তানি বাহিনী ভড়কে যায়। আর সামনে এগোয়নি তারা। বিশেষ ট্রেনটি পুনরায় পাকিস্তানি বাহিনীর তিন শতাধিক সদস্যকে ফিরিয়ে নেয় পার্বতীপুর হয়ে সৈয়দপুর সেনানিবাসে। যে বীর মুক্তিযোদ্ধা জীবন বাজি রেখেছিলেন দিনাজপুরবাসীকে রক্ষার জন্য, তিনি নিজেই আজ অসহায়-পরাধীন!
মুক্তিযোদ্ধা তোরাবের সঙ্গে কথা বললে কেঁদেই ফেলেন তিনি। জানান, ভিটেমাটির ১২ শতক জমির ওপর নজর পড়েছে তাঁর বিমাতা ভাইদের। গ্রামের একটি দুষ্কৃতকারী চক্রের ষড়যন্ত্রে ভাইয়েরা এখন তাঁকে উচ্ছেদ করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। চক্রটি একাত্তরের পরাজিত শক্তি। যাদের দোর্দণ্ড দাপট এখনো বড় হাশিমপুরে। বারবার হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে, যেন এখনই চলে যাই সহায়-সম্পত্তি সবকিছু ছেড়ে। রাতে দুষ্কৃতকারীরা বাড়ির সদর দরজার সামনে অস্ত্র হাতে ওত পেতে থাকে। গোটা পরিবার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে ভয় পায়।
এসএসসি পরীক্ষায় মুক্তিযোদ্ধা তোরাব প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। মেধাবী ওই মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা কি শিক্ষার সুযোগ পাবে না? বড় আতঙ্কে আছে ওরা। স্বাধীনতার জন্য জীবনটাকে হাতের মুঠোয় নিয়েছিলেন তোরাব, অথচ তাঁর পরিবার আজ স্বাধীন দেশে বড্ড অসহায়। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে নিয়ে তোরাবের পরিবার আজ নিরাপত্তাহীন।
যাঁর বীরত্বের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ হাতে লেখা চিঠি দিয়েছিলেন। সেই তোরাব কি স্বাধীন বাংলাদেশেও এতটা অসহায়ই হয়ে রইবেন?