Saturday, February 05, 2011

জামায়াতের সামনে তিন সংকট

আগামী দিনে দলের রাজনীতির জন্য গুরুতর সংকট সৃষ্টি করতে পারে-এমন তিনটি ইস্যুর সম্মুখীন হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইস্যু তিনটির একটি দলের অভ্যন্তরীণ, বাকি দুটি রাজনৈতিক। অভ্যন্তরীণ সংকটের সমাধানের ব্যাপারে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা মোটামুটি আস্থাশীল হলেও বাকি দুই সম্ভাব্য সংকট নিয়ে বেশ উৎকণ্ঠায় আছেন তাঁরা।

সূত্রের দাবি, এ বিষয়ে দলের অবস্থান ঠিক করতে গতকাল শুক্রবার ডাকা কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বিশেষ অধিবেশনে আলোচনা হওয়ার কথা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিন সংকটের অন্যতম হচ্ছে নির্বাচন কমিশন থেকে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিট মামলা। আদালতের কার্যতালিকা অনুযায়ী আগামীকাল রবিবার এ মামলার শুনানি হওয়ার কথা। মামলার ফলাফল প্রতিকূলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করে জামায়াতের নীতি-নির্ধারণীপর্যায়ের নেতারা খুব চিন্তায় পড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য মতে, বাকি দুই সংকটের একটি হচ্ছে দলের নতুন ‘আমির’ নির্বাচন। অন্যটি হচ্ছে সারা দেশে অনুষ্ঠিত
পৌরসভা নির্বাচনের আগে ও পরে স্থানীয়পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ছন্দপতনে জামায়াতের ভবিষ্যৎ রাজনীতি।
বিষয় তিনটির উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এ টি এম আজহারুল ইসলাম দাবি করেন, কোনোটিই জামায়াতের রাজনীতির জন্য সংকট সৃষ্টি করবে না।
নিবন্ধন বাতিলের আশঙ্কা : জামায়াতে ইসলামীর নাম ও এর গঠনতন্ত্রের অন্তত ছয়টি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে দলটির নিবন্ধন বাতিল চেয়ে ২০০৮ সালে ব্যারিস্টার তানিয়া আমীর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। মামলাটি বিচারাধীন রেখেই জামায়াত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। নিবন্ধন বাতিলের আরজি করে দায়ের করা ওই মামলাটি আবার সক্রিয় হয়েছে।
জামায়াতের শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা এ মামলায় হেরে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তবে তাঁরা বিষয়টিকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেই মনে করছেন। আইন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সম্প্রতি উচ্চ আদালতের রায়ে বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃস্থাপন ও সে আলোকে সংবিধান পুনর্মুদ্রণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো এমনিতেই বিলুপ্ত হওয়ার কথা। কিন্তু এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট না হওয়ায় ধর্মভিত্তিক দলগুলো এখনো প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জামায়াতের নাম ও এর গঠনতন্ত্রের ধারার সংশোধিত সংবিধানের সঙ্গে বিরোধ থাকলে আদালত দলটির নিবন্ধন বাতিলের রায় দিতে পারেন।
এ টি এম আজহারুল ইসলামও মনে করেন, বাহাত্তরের সংবিধানকে বেইজ ধরলে কোর্ট নিবন্ধন বাতিলের রায় দিতেও পারেন। তবে তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন নিবন্ধন বাতিল করলে তাঁরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাবেন। তিনি বলেন, নিবন্ধন বাতিল মানে তো দল বাতিল নয়। বিষয়টি এই নয় যে এর মাধ্যমে দলের রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে।
মামলার বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে এ মামলার কুশলী ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘জামায়াত একটি গণতান্ত্রিক ও ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী রাজনৈতিক দল। কৃত্রিমভাবে কোনো আইন তৈরি করে জামায়াতকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা কল্যাণকর হবে না।’
সময় চাইবে জামায়াত : নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করা মামলাটির শুনানি পেছাতে জামায়াতের পক্ষ থেকে আবেদন করা হবে। সহসা যাতে মামলার নিষ্পত্তি না হয়, সে জন্য তাঁরা আইনজীবীর মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করার কৌশল নিতে পারেন। এক প্রশ্নের জবাবে এ বিষয়ে দলের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, ‘এটা এমন ইস্যু নয় যে এখনই শেষ করতে হবে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হাজার হাজার মামলা আছে। আমরা সময় চাইব।’
জানা গেছে, খুব অল্প সময়ের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আগামী মার্চের শেষ নাগাদ মামলার রায় হয়ে যেতে পারে।
নতুন আমির নির্বাচন : ২০১২ সাল পর্যন্ত নির্বাচিত জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর দায়িত্ব পালনে অক্ষমতার মেয়াদ ছয় মাসের বেশি হওয়ায় দলের একটি অংশে নানা রকম চিন্তাভাবনা চলছে। এ অংশটি বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমিরের অন্তর্বর্তীকালীন শেষে নতুন আমির নির্বাচনের পক্ষে।
মতিউর রহমান নিজামী প্রথমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার একটি মামলায় ও পরে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন সাত মাস আগে। গ্রেপ্তারের আগে তিনি নায়েবে আমির মকবুল আহমদকে ভারপ্রাপ্ত আমির নিয়োগ দিয়ে যান।
দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আগামী মে মাসে ভারপ্রাপ্ত আমিরের অন্তর্বর্তী সময় শেষ হবে। এ মেয়াদের পর বিশেষ কারণ না থাকলে নতুন আমির নির্বাচনের কথা উল্লেখ আছে।
নিজামীর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০১২ সালে অবশ্যই নতুন আমির নির্বাচন করতে হবে। কিন্তু দলের ওই অংশটি গঠনতন্ত্রের ‘বিশেষ অবস্থার’ সুযোগ না নেওয়ার পক্ষে। তারা অতীতে গোলাম আযমের মতো মাওলানা নিজামীকে আমির পদে রেখে অন্তর্বর্তীকালীন আমিরের মেয়াদ দীর্ঘস্থায়ী করার পক্ষপাতী নয়।
বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমির প্রথম ছয় মাস পার করার পর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের অনুমোদন নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে আরো ছয় মাসের দায়িত্ব পেয়েছেন। এই মেয়াদের পরই নির্বাচন হওয়ার কথা। নতুন আমির নির্বাচনের পক্ষে থাকা অংশটি মনে করে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো একটি জটিল মামলায় আটক নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। দলের গতিশীল নেতৃত্বের জন্য এত সময় অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।
কিন্তু জামায়াতের মূলধারা এই চিন্তার সঙ্গে একমত নয়। তারা মনে করে, বিচারের আগেই শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়া অমানবিক এবং আদালতের আগেই বিচারের শামিল বলে বিবেচিত হবে।
সূত্রে জানা গেছে, গতকাল অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার বৈঠকের আলোচনায় ভারপ্রাপ্ত আমিরের বর্ধিত ছয় মাসের মেয়াদ অনুমোদন ও এই মেয়াদ শেষে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের প্রসঙ্গটি ছিল। এ বিষয়ে শুরার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত জানা যায়নি।
বৈঠকের আগে বিষয়টির উল্লেখ করে বক্তব্য জানতে চাইলে এ টি এম আজহার বলেন, ‘২০১২ সাল পর্যন্ত নেতৃত্ব নিয়ে কোনো চিন্তার কারণ নেই। এ নিয়ে আমরা চিন্তা করছি না।’
তিনি বলেন, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত আমিরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা হয় নির্বাচন, না হয় স্বাভাবিক মেয়াদ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের সময় বাড়াতে পারবে।
বিএনপির সঙ্গে ছন্দপতন : এবারের পৌরসভা নির্বাচনে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কে বড় ছন্দপতন হয়েছে। কোনো কোনো জায়গায় তিক্ততারও সৃষ্টি হয়। পৌর নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি আগামীতে চারদলীয় জোটে জামায়াতকে কোণঠাসা করারও ইঙ্গিত দিয়েছে। কিন্তু জোটে বিভক্তি হতে পারে আশঙ্কা করে জামায়াতের নেতারা তা হজম করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের একজন নেতা বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনে আবারও প্রমাণ হলো জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ-বিএনপি সবাই এক। আমরা দেখেছি, যেসব পৌরসভায় জামায়াত প্রার্থীদের সম্ভাবনা ছিল, সেসব জায়গায় কোথাও আওয়ামী লীগ পক্ষ নিয়েছে বিএনপির, কোথাও বিএনপির পক্ষ নিয়েছে আওয়ামী লীগ।’
জামায়াত এবার ৪৩টি পৌরসভায় মেয়র ও সাড়ে তিন শ’ কাউন্সিলর প্রার্থী দিয়ে ছয়টি মেয়র ও ১১০টি কাউন্সিলর পদে জয় পেয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে ৪৩টি পৌরসভাতেই বিএনপির স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে জামায়াতের গোপনে-প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব ছিল।
বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, ‘এবারের পৌর নির্বাচন আমাদের জন্য উৎসাহের এবং সতর্কেরও।’
নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জামায়াতের বেশির ভাগ প্রার্থী হেরেছেন বিএনপি প্রার্থীর কাছে। বিশেষ করে জামায়াত প্রভাবিত এলাকা হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া, সাতকানিয়া ও কক্সবাজারে এই ঘটনা ঘটেছে।
জানা গেছে, পৌর নির্বাচনের আগে থেকে বিএনপির বেশ কজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা জামায়াতকে এড়িয়ে চলছেন। তাঁদের ভূমিকায় পৌর নির্বাচনে সমঝোতার লক্ষ্যে তিন দফা বৈঠক করেও শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। জামায়াতের প্রার্থিতা থাকার পরও পৌর নির্বাচনের এ ফলাফলে বিএনপিতে আÍবিশ্বাস জেগেছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে চারদলীয় জোটে জামায়াতের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতারা চিন্তিত। জানা গেছে, গতকালের মজলিসে শুরার বৈঠকে এ বিষয়টিও আলোচনার অন্যতম বিষয়বস্তু ছিল। তথ্য মতে, শুরার সদস্যরা কারো দিকে চেয়ে না থেকে দলের অবস্থান মজবুত করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
পৌর নির্বাচনকে জামায়াত কিভাবে মূল্যায়ন করছে জানতে চাইলে দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি বলেন, ‘পুরো একটি বছর আমরা সরকারের কোপানলে ছিলাম। সে হিসেবে উৎসাহব্যঞ্জক।’
দলের ভারপ্রাপ্ত আমির মকবুল আহমদ বলেন, ‘তারা (সরকার) আমাদের মুছে ফেলতে চেয়েছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমরা ছয় মেয়র ও ১১০ কাউন্সিলর পেয়েছি।’ পৌর নির্বাচনে বিএনপির আÍবিশ্বাস জামায়াতকে জোটে কোণঠাসা করবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না সেটা ঘটবে।’

বিএনপির দুর্বলতায় ফসকে যায় ইস্যু

প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সামনে ইস্যু আসছে আর যাচ্ছে। কিন্তু আন্দোলন আর দানা বাঁধছে না। দলে কোন্দল এবং তৃণমূল পর্যায়ে নেতৃত্বহীনতার কারণেই কোনো ইস্যু কাজে লাগাতে পারছে না দলটি। এ ছাড়া ছোটখাটো ইস্যুতে রাস্তায় নামলেও পুলিশের সামনে দাঁড়াতেই পারছে না দলের নেতা-কর্মীরা।

সর্বশেষ আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর নির্মাণের ইস্যুও হাতছাড়া হয়ে গেছে সরকার এ কর্মসূচি থেকে সরে আসায়। আগামী সোমবারের হরতাল কর্মসূচি কতটুকু সফল করা যাবে, তা নিয়ে বিএনপি নেতাদের মধ্যেই রয়েছে সংশয়। এ জন্য দলের নেতাদের নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল শুক্রবার কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। ইস্যু থাক আর না থাক, সেটা বড় কথা নয়, দলের ভেতরে যে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দুর্বলতা আছে, তা খুঁজে বের করে অচিরেই সমাধান করা হবে। তিনি বলেন, সোমবারের দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল সফল করাই এখন দলের নেতা-কর্মীদের মূল দায়িত্ব। হরতাল সফল করতে দলীয় নেতাদের নিয়ে প্রতিনিয়ত বৈঠক হচ্ছে। হরতালের পর দলের দুর্বলতার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ সরকারের আমলে গত দুই বছরে বিএনপি ইতিমধ্যে তিনটি হরতাল কর্মসূচি পালন করেছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি বাতিলের দাবিতে গত বছরের ২৭ জুন দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি পালন করে দলটি। ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার অভিযোগে গত ১৪ নভেম্বর দেশব্যাপী আরেকটি হরতাল দেয় তারা। এ হরতালে বাধা দেওয়া ও হামলার অভিযোগ এনে তৃতীয় হরতালটি ডাকা হয় ৩০ নভেম্বর। তবে তিনটি হরতালের কোনোটিই সর্বাত্মক সফল হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, আগের হরতালগুলোতে বিএনপির অনেক নেতা বাসায় বসেই খোঁজ-খবর নিয়েছেন। রাস্তায় পিকেটিং ছিল না। হরতালের দিন মাঠে না থাকায় দলের সিনিয়র কয়েকজন নেতার ওপর ক্ষুব্ধ হন দলীয় চেয়ারপারসন। এ পরিস্থিতিতেই আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি রয়েছে দলটির। এ হরতালের দিনও দলের সব নেতা-কর্মী মাঠে থাকবে কি না, তা নিয়েও দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে হরতাল সফল করতে শরিক দল জামায়াতে ইসলামী ও আটটি সমমনা রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। হরতালের প্রতি সমমনা দলগুলোর পূর্ণ সমর্থন থাকলেও তাদের অনেকেরই মাঠে না থাকার সম্ভাবনা বেশি। কারণ এর আগে বিএনপির হরতালের প্রতি সমমনা দলগুলোর সমর্থন ছিল, কিন্তু কাউকে মাঠে পাওয়া য়ায়নি।
২০০৯ সালের ৮ ডিসেম্বর ঘটা করে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হলেও মাঠে সংগঠনের অবস্থা এখনো নাজুক। দলীয় কোন্দল আর চরম বিশৃঙ্খলায় ২৩ জেলায় এখনো কাউন্সিল হয়নি। অধিকাংশ জেলায় কাউন্সিল ছাড়া কমিটি গঠন করা হলেও কোন্দলের কারণে পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা সম্ভব হয়নি। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে তৃণমূল নেতাদের চাপা ক্ষোভ ক্রমেই প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। ২০০৯ ও ২০১০ সালে বছরজুড়ে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েও দল গোছাতে পারেনি বিএনপি। এবারের পৌর নির্বাচন ও উপনির্বাচনে বিএনপির অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে গেলেও কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের সাংগঠনিক অবস্থা খুবই দুর্বল। তবে পৌর নির্বাচনের বিজয়ের রেশ আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে সাংগঠনিক অবস্থা আরো জোরদার করতে হবে বলে মনে করেন তৃণমূল নেতারা।
২০০৯ সালে বছরজুড়ে বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও অধিকাংশ জেলায় জোড়াতালি দিয়ে কাউন্সিল করা হয়েছে। নামমাত্র কাউন্সিল দেখিয়ে কমিটি করা হয়েছে। কাউন্সিল দেখানো হলেও অনেক জেলায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি হয়নি। কোথাও কোথাও পাল্টাপাল্টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ কেন্দ্রে পৌঁছলে বেশ কিছু জেলার কমিটি স্থগিত রাখা হয়। এক বছর পার হলেও ওই কমিটির ব্যাপারে বিএনপি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এসব কারণে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হলেও দলের মাঠ সংগঠন শক্তিশালী হচ্ছে না।
জাতীয় কাউন্সিলের আগে দেশের ৭৫টি সাংগঠনিক ইউনিটের কাউন্সিল সম্পন্ন করতে পারেনি বিএনপি। বিশেষ করে দলের মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নিজের এলাকা মানিকগঞ্জে কাউন্সিল হচ্ছে না ১০ বছর ধরে। খোন্দকার দেলোয়ার ও হারুনুর রশিদ খান মুন্নুর মধ্যে বিরোধ চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এবার জেলার কাউন্সিল করার জন্য আহ্বায়ক করা হয়েছিল অ্যাডভোকেট মোকসেদুর রহমানকে। উভয় পক্ষের নেতাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলেও খোন্দকার দেলোয়ার তা গ্রহণ করেননি। ফলে কাউন্সিলের বিষয়টি ঝুলে আছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
এদিকে ঢাকা জেলার কমিটি গঠন করা হলেও তা নিয়ে দল বিভক্ত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ঢাকা জেলার সভাপতি ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বহিষ্কৃত হন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ঢাকা জেলার সভাপতি নির্বাচিত হন এম এ মান্নান। ঢাকা মহানগর কমিটি নিয়েও চলছে দেনদরবার। এখানে একদিকে আছেন সাদেক হোসেন খোকা, অন্যদিকে মির্জা আব্বাস। জানা যায়, নগরীর এই দুই প্রভাবশালী নেতার বিরোধের কারণেই নগর কমিটি ঘোষণা করতে পারছেন না বিএনপির চেয়ারপারসন।
সারা দেশে ৭৫ সাংগঠনিক জেলার মধ্যে যেসব জেলায় কাউন্সিল হয়নি তার মধ্যে আছে ঝালকাঠি, দিনাজপুর, পাবনা, বগুড়া, গাজীপুর, নোয়াখালী, বরগুনা, জামালপুর, মাদারীপুর, পটুয়াখালী, রংপুর, চাঁদপুর, নওগাঁ, শরীয়তপুর, ঢাকা জেলা, ঢাকা মহানগর, মানিকগঞ্জ, নেত্রকোনা, পিরোজপুর, বরিশাল (দক্ষিণ), বরিশাল মহানগর, খুলনা জেলা ও নড়াইল জেলা। তবে বিএনপির অবস্থা যে করুণ, তা মানতে চান না দলের অধিকাংশ নেতা। তাঁরা মনে করেন, ভবিষ্যতে বিএনপির অবস্থা ভালো হবে। সাংগঠনিকভাবে এগিয়ে যাবে এই দল।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, কাউন্সিলের পর বিএনপি এক বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে সাংগঠনিক অবস্থা আরো শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, গত দুই বছরে সরকার যেভাবে বিএনপির নেতা-কর্মীর ওপর মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি-নির্যাতন করেছে। এর মধ্যেও বিএনপি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, এটা অনেক বড় ব্যাপার। বিশেষ করে পৌরসভা ও উপনির্বাচনের পর বিএনপির মধ্যে প্রত্যয় বাড়ছে। ভবিষ্যতে সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে বিএনপি-কে চাঙ্গা করা হবে বলে মন্তব্য করেন দলের সিনিয়র এ নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, দলের সাংগঠনিক অবস্থা আগের চেয়ে অনেক ভালো। ‘ইস্যু ধরে রাখতে পারছি না, তা ঠিক নয়’ দাবি করে তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলের একটা কৌশল থাকে, বিএনপিরও একটি কৌশল আছে। আর আন্দোলন করলেই যে দলের অবস্থা ভালো হবে, তা ঠিক নয়। পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর দলের অনেক কিছু নির্ভর করে। তার প্রমাণ হলো বিএনপি আন্দোলন না করেও আওয়ামী লীগের চেয়ে বেশি ক্ষমতায় ছিল।
খন্দকার মোশাররফ আরো বলেন, ‘দলের কৌশলের ওপর নির্ভর করছে ইস্যু ধরে রাখব কি রাখব না। তবে ভবিষ্যতে বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা আরো জোরদার হবে এবং বিএনপি জনগণের ভোটে ক্ষমতায় যাবে।’

Thursday, February 03, 2011

বিবেকের কড়া নেড়ে গেল কিশোরী হেনা

মা আকলিমা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। হেঁটে মেয়ের লাশের পাশেও যেতে পারছেন না। বাবা দরবেশ খাঁ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। বিড়বিড় করে বলছেন, ‘আমার মেয়েটি এভাবে মেরে ফেললো, কেউ প্রতিবাদ করলো না। আল্লাহ, তুমি পাষণ্ডদের শাস্তি দিয়ো।’ সমাজপতিদের দোররার আঘাতে তাঁদের কিশোরী মেয়ে হেনা আক্তার মারা গেছে সোমবার রাতে। গতকাল বুধবার বিকেল চারটায় মেয়ের লাশ বাড়ি এসেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়েছে পরিবার-প্রতিবেশীরা। দরিদ্র দরবেশ খাঁর বাড়িতে কাল যেন মানুষের ঠাঁই ধরে না। শত শত মানুষ ছুটে এসেছে। হেনার পরিবারের সদস্যদের কান্নার ঢেউ গিয়ে লেগেছে তাদের অনেকের মনে। চোখ ভিজে গেছে তাদের। হেনার করুণ মৃত্যু ক্ষুব্ধ করেছে অনেককে, নাড়া দিয়েছে বিবেকে। দোষীদের শাস্তি চেয়েছে তারা।
শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা গ্রামে ফতোয়াবাজেরা ধর্ষণের শিকার ১৪ বছরের কিশোরী হেনাকে ৭০-৮০টি দোররা মারলে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। হাসপাতালে নেওয়ার পর সে মারা যায়। গ্রামের অনেকের সামনেই ঘটেছে এই দোররা মারার ঘটনা, কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায়নি। ধর্ষক মাহাবুবের স্ত্রীর বড় বোন জাহানারা হেনাকে দোররা মেরেছেন।
হেনাদের প্রতিবেশী হোসনে আরা বলেন, ‘সালিসে আমরা উপস্থিত ছিলাম। সেখানে মাওলানারা প্রথম হেনাকে মাটিতে গেড়ে পাথর মারার নির্দেশ দিয়েছিলেন। অন্য সালিসদারদের অনুরোধে পাথর মারার পরিবর্তে তাকে দোররা মারার রায় দেওয়া হয়। আমরা উপস্থিত থেকে শুধু চোখের পানি ফেলেছি। কোনো প্রতিবাদ করার সাহস পাইনি।’
আরেক প্রতিবেশী নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সালিসে কথা বলার কোনো সুযোগ পাইনি। দাঁড়িয়ে থেকে আক্ষেপ করেছি। গরিব লোক বলে তাদের সঙ্গে এটা করা সম্ভব হয়েছে।’
বিক্ষোভ, সমাবেশ, মানববন্ধন: তবে হেনার মৃত্যু আবার বিবেকবোধে তাড়িত করেছে অনেককে। তারা ধর্ষক মাহাবুব ও ফতোয়াবাজদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শরীয়তপুরে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে। বেলা ১১টায় পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট, আমরাই পারি নারীর বিরুদ্ধে সব নির্যাতন বন্ধ করতে, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ও স্থানীয় বেসরকারি সংগঠন এসডিএস জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করে। মানববন্ধন শেষে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করা হয়। বিক্ষোভ শেষে সমাবেশে বক্তব্য দেন রওশন আরা, অমল দাস, আসমত আলী খান, আহসান উল্লাহ ইসমাইলী প্রমুখ।
দুপুর ১২টায় প্রথম আলো বন্ধুসভা শরীয়তপুর সরকারি কলেজ সড়কে মানববন্ধন করে।
লাশ দাফন: শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ গতকাল দুপুর ১২টায় হেনার মৃতদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। বিকেল পাঁচটায় চামটা গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক মো. সানোয়ার হোসেন, পুলিশ সুপার এ কে এম শহিদুর রহমান জানাজায় অংশ নেন।
চারজন রিমান্ডে, অন্যরা অধরা: মঙ্গলবার রাত ১০টায় নিহত হেনার বাবা বাদী হয়ে নড়িয়া থানায় ১৮ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ গ্রেপ্তার হওয়া চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করলে বিচারিক হাকিম আবদুল মান্নান আসামি শিল্পী বেগমের তিন দিন, মসজিদের ইমাম মফিজ উদ্দিনের দুই দিন, জয়নাল মীরমালত ও আলাবক্স করাতীর এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। প্রধান আসামি ধর্ষক মাহাবুব ও অন্য ফতোয়াবাজদের পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা কেউ রেহাই পাবে না। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য বিভিন্ন জায়গায় সোর্স লাগানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. সানোয়ার হোসেন বলেন, ‘এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি আমাদের হতভম্ব করেছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের সঙ্গে আমরা সার্বক্ষণিক সমন্বয় করছি।’
প্রলোভন: নিহত হেনার পরিবারের অভিযোগ, ঘটনা ধামাচাপা দিতে হেনার পরিবারকে সাত লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন হেনা হত্যা মামলার আসামি চামটা ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইদ্রিস ফকির। হেনার ভাই ইকবাল হোসেন বলেন, ‘আমরা হতদরিদ্র মানুষ। এর সুযোগ নিয়ে টাকা দিয়ে মাহাবুব ও ফতোয়াবাজদের নেতা ইদ্রিস মেম্বার মীমাংসা করতে চায়। মামলা না চালানোর শর্তে তারা আমাদের সাত লাখ টাকা দিতে চায়।’ তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতে ইদ্রিস মেম্বারের এক আত্মীয়ের বাড়িতে সভা করে টাকা দিয়ে মীমাংসা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার বোন চলে গেছে, টাকা দিয়ে কী হবে? আমরা হত্যাকারীদের বিচার চাই।’
হেনার বাবা দরবেশ খাঁ বলেন, ‘আমার মেয়েকে ধর্ষণ করার পর কোনো বিচার পেলাম না। উল্টো মেয়েকে বিচারের মুখোমুখি হয়ে জীবন দিতে হলো। এমন সমাজে বসবাস করতেও কষ্ট লাগছে। আমি কোনো টাকাপয়সা চাই না, মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’
চামটা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন রাঢ়ী বলেন, নৃশংস এই ঘটনায় এলাকার মানুষ হতবাক হয়ে গেছে। সবাই অভিযুুক্তদের শাস্তি দাবি করছে। তিনি বলেন, ‘একটি চক্র হেনার পরিবারকে টাকা দিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বলে শুনেছি।’
পূর্বাপর হেনা: হেনা পঞ্চপল্লী গুরুরাম উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে। অর্থকষ্টের কারণে ২০০৮ সালে পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায়। রোববার রাত আটটার দিকে প্রাকৃতিক কাজে ঘরের বাইরে গেলে হেনাকে প্রতিবেশী মাহাবুব (৪০) ধর্ষণ করেন। হেনার চিৎকারে দুই পরিবারের লোকজন বেরিয়ে আসে। এর মধ্যে মাহাবুবের স্ত্রী শিল্পী বেগম ও দেবর নিপু ঘটনার জন্য হেনাকে দোষারোপ করে মারধর করেন। সোমবার বিকেলে সালিস বৈঠকে মাহাবুবের পাশাপাশি হেনাকেও ১০০ দোররা মারার রায় দেন সমাজপতিরা। ৭০-৮০টি দোররা মারার পর হেনা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। হাসপাতালে নিলে সে মারা যায়।
গ্রামের আবুল হাশেম মীর বলেন, হেনার বাবা সহজ-সরল গরিব কৃষক। অন্যের জমিতে শ্রম বিক্রি করে সংসার চালান। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সংসার। ছোট মেয়ে হেনা শান্ত স্বভাবের ছিল। এমন একটি অসহায় পরিবারের সঙ্গে এই নির্মমতা এলাকার মানুষের মনে নাড়া দিয়েছে।’
হেনাদের বাড়িতে দুটি ছোট টিনের ঘর। একটিতে হেনার চাচা থাকেন। আরেকটি ঘরে থাকে হেনারা। গতকাল টিনের সে ঘরটি ঘিরে ছিল এলাকার কয়েক শ মানুষ। স্বজনেরা ঘর আর আঙিনায় বসে বিলাপ করছে।
মুন্সিগঞ্জেও মানববন্ধন: মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মুন্সিগঞ্জে প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে মানববন্ধন হয়েছে। দুপুর দুইটার দিকে জেলা শিল্পকলা একাডেমীর সামনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে বন্ধুসভার কেন্দ্রীয় পরিচালনা পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক সাইদুজ্জামান রওশন, বন্ধুসভার সভাপতি খালেদা খানম, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি মতিউল ইসলাম, বন্ধুসভার উপদেষ্টা তানভীর হাসানসহ বন্ধুসভার সদস্যরা অংশ নেন।

কেমন আছেন রিতা-মিতা

বাড়িটা এখনো ভূতের বাড়ি বলে পরিচিত। সেই বাড়িতে থাকেন রহস্যময় দুই বোন। মনে আছে তাঁদের কথা? মনে পড়ে যাওয়ারই কথা। যদিও মাঝে পাঁচ বছর কেটে গেছে। কেমন আছেন সেই দুই বোন রিতা-মিতা? তাঁদের কথা জানতে প্রথমে যোগাযোগ করা হয় আইনজীবী এলিনা খানের সঙ্গে। তিনি বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী হিসেবে বর্তমানে কর্মরত। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই দীর্ঘ ১৬ ঘণ্টা চেষ্টার পর মিরপুরের সেই বাড়ি থেকে দুই বোনকে প্রথমে বের করে আনেন তিনি।
এলিনা খানই জানান, দুই বছর হলো তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ নেই। তবে আগের বাড়িতেই আছেন। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি এলিনা খান ও তাঁর দুই সহকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলাম রিতা-মিতার বাড়ির সামনে। এলিনা খান দেখিয়ে দিলেন কোন দোকান থেকে তাঁরা প্রতি মাসে ভাড়া পান। উডল্যান্ড ফার্নিচারের সেই দোকানের স্বত্বাধিকারীকে দোকানে না পেয়ে টেলিফোনে কথা হয়। দোকানের স্বত্বাধিকারী পনু বললেন, ‘প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা দোকানভাড়া নিয়ে যান রিতা। মিতা কখনো আসেন না। মাঝেমধ্যে সকাল ছয়টা-আটটার দিকে হাঁটতে বের হন দুই বোন। মেয়েকে সকালে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার সময় দেখি তাঁদের। পাউরুটি, দুধই তাঁরা এখন খেয়ে থাকেন। আমার মনে হয়েছে, মিতা বেশ অসুস্থ। তাঁর চিকিৎসা দরকার।’ মিরপুরের সেই বাড়ির সামনে চিকিৎসক আইনুন নাহার রিতার একটি সাইনবোর্ড লাগানো। বাড়ির গেটে আর্বজনার স্তূপ। ভেতর থেকে বড় তালা ঝোলানো। পাশের নির্মাণাধীন বাড়ির দারোয়ান বললেন, ‘আমি বের হতে দেখি না। বড় বোন বের হয়। তাও সপ্তাহে একদিন। তখন শুধু তরল দুধের প্যাকেট আর পাউরুটি কিনতে দেখি। রাতে ১১টার পরে বের হয়।’ এলিনা খান বললেন, ‘এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়। প্রথম দিকে যখন ওরা মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ ছিল, তখন দুধ, পাউরুটি খেয়ে থাকত। সুস্থ হওয়ার পর স্বাভাবিক সব খাবারই খেয়েছে।’ গেটে ধাক্কা দিয়ে ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। পরিত্যক্ত বাড়ির মতো লাগছে। ঝোপঝাড়, চারপাশে আর্বজনা, পোকামাকড়ের বসতি যেন। দেয়াল টপকে গেলেন সঙ্গে থাকা আলোকচিত্রী। অনবরত জানালায় শব্দ করে, ডাকাডাকি করেও কোনো সাড়া আসছিল না ভেতর থেকে। সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ, হঠাৎ ঘরের মধ্য থেকে বের হলেন একজন। এলিনা খান ও তাঁর সহকর্মী মাহমুদাকে দেখেই বারান্দার গ্রিলের ওপাশ থেকে রিতা রাগে গজগজ করতে থাকেন। রিতা বলেন, ‘আল্লাহর গজব নাজিল হবে। শান্তিতে থাকতে দিতে চাও না। আবার সম্পত্তির লোভে আসছ?’ বলেই ভেতরে ঢুকে যান। পরে আর বের হননি দুই বোনের কেউই। পরে এলিনা খান বললেন, ‘আমাকে দেখলে ভাবেন, বোধহয় বাসা থেকে বের করে নিয়ে যাব। আইনুন নাহার রিতা সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। আর মিতা বুয়েট থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বিদেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। তাঁদের বাবা মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি নিয়ে নানা ধরনের ঝামেলা হয়। সেখান থেকেই সমস্যাটার শুরু হয়। তাঁদের মা প্রায় ১০ বছর স্বাভাবিক জীবন যাপন করেননি। জানা যায়, তিনিও সিজোফ্রেনিয়ার রোগী ছিলেন। রিতা-মিতাও সেই রোগে আক্রান্ত। তাঁরা অপুষ্টি আর নানা রোগে আক্রান্ত ছিলেন। অনেক চেষ্টা করে বের করে এনেছিলাম। ২০০৮ সালে দ্বিতীয়বার বের করি। অনেক নাটক করতে হয়। তাঁদের আরেক বোন আছেন, যাঁর সঙ্গে অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু পাইনি। তাঁদের সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া যেকোনো কাজে মনটাকে ব্যস্ত রাখলে হয়তো তাঁরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন। সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে, তাঁরা যদি খুব অসুস্থ হন কিংবা মৃতপ্রায় অবস্থা হলেও তো কেউ জানবে না।’
২০০৫ সালে যখন নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত, তখন তাঁদের প্রথমে ঢাকার ধানমন্ডি ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে নিয়ে যাওয়া হয় সেন্ট্রাল হাসপাতালে। সেখানে চিকিৎসক সেহেরীন এফ সিদ্দিকা, খাজা নাজিমুদ্দিন ও মোহিত কামাল দুই বোনের চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। বর্তমানে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সেহেরীন এফ সিদ্দিকার সঙ্গে কথা হয় তাঁদের নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমরা তিন চিকিৎসক মিলেই ওদের চিকিৎসা দিয়েছিলাম। ওদের মেয়েলি কিছু রোগ ছিল। তার চিকিৎসা দিয়েছিলাম। সেরেও ছিল। ফলোআপের জন্য পরেও এসেছিল বেশ কয়েকবার।’ রিতার চিকিৎসক বন্ধুদের কাছে খোঁজখবর করেছিলাম। পরে তাঁরাও আর কিছু বলতে পারেনি।

মেয়েটির জন্য কারও মায়া হলো না!

১৪ বছরের কিশোরী হেনা ৭০-৮০টি দোররার আঘাতের পর মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার আগে ছোট্ট এই মেয়েটি সয়েছে ধর্ষণের ভয়ংকর শারীরিক-মানসিক যন্ত্রণা। মৃত্যু তাকে হয়তো সব যন্ত্রণা আর এই কুৎসিত সমাজ থেকে মুক্তি দিয়েছে।

হেনার ফুফাতো বোনসহ আত্মীয়রা জানান, শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চামটা গ্রামের দরিদ্র কৃষক দরবেশ খাঁর মেয়ে হেনা। গত রোববার দিবাগত রাতে মেয়েটি প্রাকৃতিক কাজে ঘরের বাইরে যায়। এ সময় তার দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই মাহাবুব (৪০) তার মুখে কাপড় গুঁজে দিয়ে পাশে তার পরিত্যক্ত একটি ঘরে নিয়ে ধর্ষণ করেন। মেয়েটির চিৎকারে প্রথমে মাহাবুবের স্ত্রী ও ভাই বেরিয়ে আসেন। কিন্তু তাঁরা মেয়েটিকে উল্টো মারধর করেন। একপর্যায়ে হেনার বাবা-মা, ভাই-বোনসহ বাড়ির লোকজন বের হয় এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করে। হেনাদের ঘর থেকে মাহাবুবের ঘরের দূরত্ব ২০-২৫ গজ হবে বলে জানিয়েছে স্বজনেরা।
নড়িয়া থানা ও এলাকার সূত্র জানায়, ঘটনা জানাজানি হলে পরের দিন সোমবার চামটা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য ইদ্রিস ফকিরের নেতৃত্বে সালিস বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সালিসে উপস্থিত হন চামটা আবুল বাশার মাদ্রাসার শিক্ষক সাইফুল ও গ্রামের মসজিদের ইমাম মফিজ উদ্দিন। ইদ্রিস ফকির, লতিফ মীরমালত, আক্কাস, ইয়াসিন ও জয়নাল মীরমালতের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের বিচারক বোর্ড গঠন করা হয়। তাঁরা ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকের সঙ্গে পরামর্শ করে ধর্ষণকারী ও ধর্ষণের শিকার কিশোরী উভয়কেই দোররা মারার রায় দেন। মাহাবুবকে ২০০ দোররা ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আর কিশোরী হেনাকে ১০০ দোররা মারার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু ধর্ষকের শাস্তি অর্ধেক কমিয়ে তাৎক্ষণিক সালিসকারীরা তাঁকে ১০০ দোররা মারেন। হেনাকে ৭০-৮০টি দোররা মারার পর সে অচেতন হয়ে মাটিতে পড়ে যায়। স্বজনেরা তাকে উদ্ধার করে নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার রাতে হেনা মারা যায়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা গোলাম ফারুক প্রথম আলোকে জানান, সোমবার রাতে জরুরি বিভাগে ভর্তি করার কিছুক্ষণ পরই হেনা মারা যায়।
সালিসকারীরা হেনার মৃতদেহ গ্রামে নিয়ে তড়িঘড়ি দাফনের উদ্যোগ নেন। খবর পেয়ে পুলিশ গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহ উদ্ধার করে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইউপি সদস্য ইদ্রিস ফকির, ধর্ষক মাহাবুব ও সালিসকারীরা পালিয়ে যান। পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধর্ষক মাহাবুবের স্ত্রী, জয়নাল মীরমালত, আলাবক্স করাতি ও ইমাম মফিজ উদ্দিনকে আটক করে। শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার শহিদুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
হেনার বাবা দরবেশ খাঁ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমি গরিব হওয়ায় প্রভাবশালীরা আমার মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করেছেন। এভাবে দোররা মেরে মেয়েটিকে মেরে ফেলা হবে, কখনো ভাবিনি। আমি মেয়ে হত্যার বিচার চাই।’
মাহাবুবের স্ত্রী দাবি করেন, তাঁর স্বামীর সঙ্গে অসামাজিক কাজ করায় গ্রামের মানুষ হেনাকে আটক করে মারধর করে। তিনি সেখানে উপস্থিত হয়ে তাকে মারধর করেছেন।
চামটা ইউপির চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন রাঢ়ী বলেন, ‘ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ভাবতেই লজ্জা লাগছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।’
পুলিশের হাতে আটক সালিস বৈঠকে উপস্থিত থাকা আলাবক্স করাতি বলেন, ‘দোররা মারার ফতোয়া আমরা দিইনি। প্রভাবশালী সালিসকারীদের চাপের মুখে এর প্রতিবাদ করতে পারিনি। মেয়েটির এমন পরিণতি হবে বুঝতে পারলে প্রতিবাদ করতাম।’
আটক হওয়া ইমাম মফিজ উদ্দিন বলেন, ‘দোররা মারার রায় ঘোষণা করেছেন বিচারকেরা। উপস্থিত অন্যরা তা বাস্তবায়ন করেছেন। তবে সালিসকারীরা আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। আমরা বলেছি, ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে ছেলে ও মেয়ে উভয়কেই শাস্তি পেতে হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল রাতে জানান, ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের ধরতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল খায়ের ফকির গতকাল রাত নয়টার দিকে জানান, হেনার মৃতদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে গ্রেপ্তার হওয়া চারজনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
পুলিশ সুপার এ কে এম শহিদুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে।