Thursday, February 10, 2011

বিধবার ৬০ কোটি টাকার জমি সাকার দখলে

যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর বিরুদ্ধে এবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অসহায় এক বিধবার ৩০ কাঠা জমি দখলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ জমির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। বিগত জোট সরকারের সময় দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসী দিয়ে জমির মালিক ও তাঁর লোকদের উচ্ছেদ করে তাতে কিউসি প্রপার্টিজ লিমিটেডের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন সাকা চৌধুরী।

দখলে সন্ত্রাসীদের পাশাপাশি আনসার বাহিনী ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন জমির মালিক নাজমা বেগম। বর্তমানে ওই জমির একাংশে আনসারের তেজগাঁও থানা অফিস স্থাপন করা হয়েছে। দখল করা জমির নিরাপত্তা দিচ্ছেন ১০ জন আনসার সদস্য। সাকার অবৈধ স্বত্ব টিকিয়ে রাখতে সশস্ত্র আনসার বাহিনীর সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাধীন ১/ই ও ৩/৩, দক্ষিণ বেগুনবাড়ী (এফডিসি-সংলগ্ন পূর্ব পান্থপথ) নামক স্থানে ৩০ কাঠা জমির মালিক নাজমা বেগম। তিনি এই জমি সিএস, এসএ ও আরএস রেকর্ডে মালিক আব্দুস সোহবান বেপারীর কাছ থেকে সাফ কবলা দলিলমূলে প্রায় ৩০ বছর আগে কিনেছিলেন। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সর্বশেষ মহানগর জরিপেও জমির মালিক হিসেবে নাজমা বেগমের নাম রেকর্ডভুক্ত হয়েছে। সেখানে দোকানপাট ও গাড়ির শোরুম নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ভোগদখল করে আসছিলেন তিনি। বিগত জোট সরকারের সময় জাল দলিল করে সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে সাকা চৌধুরী জমিটি দখল করে নেন বলে অভিযোগ করেন নাজমা বেগম। সে সময় থানা-পুলিশ, আদালত ও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা আনসার কর্মকর্তা আলীম জানান, আনসার হেডকোয়ার্টার ও মহানগর পুলিশ কমিশনারের নির্দেশেই যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত সাকা চৌধুরীর দাবি করা জমির নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ওই জমি দখলে নিলেও সাকা চৌধুরী সেখানে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে পারেননি। এমনকি সীমানা-প্রাচীরও নয়। প্রয়োজনীয় পানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে না পারায় আনসারের পক্ষ থেকে কিউসি প্রপার্টিজকে একাধিকবার নোটিশ দেন জেলা কমান্ড্যান্ট। এ ছাড়া গত বছরের ১৯ এপ্রিল আনসারের পক্ষে প্লাটুন কমান্ডার মো. আব্দুল খালেক এ সম্পত্তি থেকে ফোর্স প্রত্যাহারে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দিলেও তা কার্যকর হয়নি। ওই চিঠিতে আনসারের অস্ত্র নিরাপদ নয়_এমন কথাও বলা হয়েছে।
পাহারারত ১০ সদস্যের আনসার দলের প্লাটুন কমান্ডার (পিসি) আবদুস সাত্তার জানান, জমির মালিকানা-স্বত্ব সম্পর্কে তাঁরা কিছুই জানেন না। তবে শুনেছেন, চট্টগ্রামের সাকা চৌধুরীর পারিবারিক কম্পানি কিউসি প্রপার্টিজ এ জমি গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে দীর্ঘমেয়াদি লিজ নিয়েছে। যদিও লিজের জমিতে বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস লাইনের ব্যবস্থা করতে পারেনি তারা। তিনি বলেন, কম্পানি আনসারদের জেনারেটর, এলপি গ্যাস ও পানি কেনার টাকা দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আনসার সদস্য জানান, সঠিক দলিলপত্র ও জমির স্বত্ব না থাকার কারণে কিউসি প্রপার্টিজের পক্ষে এসব সংযোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া ২০১০ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা জেলা আনসার কমান্ড্যান্ট মো. ঈশান আলী রাজা কিউসি প্রপার্টিজের কম্পানি সেক্রেটারি বরাবর লেখা এক চিঠিতে সেখানে আনসার ক্যাম্প রাখা আনসারের নীতিমালা পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সমস্যার কথা উল্লেখ করে গত ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব সমস্যা সমাধান না হলে ১১ ডিসেম্বর আনসার প্রত্যাহার করা হবে বলে ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত আনসার প্রত্যাহার করা হয়নি।
নাজমা বেগমের পরিবারের লোকজন বলেন, একটি অসহায় পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর পক্ষে আনসারের সরকারি অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ বর্তমানে সরকারের নির্দেশে দেশের সব বিরোধপূর্ণ জমির নিরাপত্তায় থাকা আনসার বাহিনীর অস্ত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে খোদ আনসার কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন। তাঁরা আরো জানান, দখলের আগে ওই জমিতে নাজমা বেগমের নামে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের লাইন ছিল। পরে তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে দখল হয়ে যাওয়া জমি থেকে এসব লাইন বিচ্ছিন্ন করা হয়।
নাজমা বেগমের ভাতিজা বাহার অভিযোগ করেন, প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরীর পক্ষে কাজ করছেন। জমি দখলে নেওয়ার জন্য সাকা চৌধুরীর লোকজন নাজমা বেগমের বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মিথ্যা মামলা করেছে। এর মধ্যে জমির সঠিক দলিল উপস্থাপন ও আদালতে হাজির না হওয়ার কারণে ছয়টি মামলা খারিজ হয়ে গেছে। বর্তমানে ৯টি মামলা বিচারাধীন।
নাজমা বেগম অভিযোগ করেন, বিগত জোট সরকারের সময় সাকা চৌধুরী একবার তাঁকে মতিঝিলের অফিসে ডেকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিয়ে বলেন, 'কিছু টাকা-পয়সা দিয়ে দিই, জমির দাবি থেকে সরে যান।'
তেজগাঁওয়ের কিউসি প্রপার্টিজের দখলে থাকা এ জমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন কম্পানির মহাব্যবস্থাপক মানিক রতন রায় ও ব্যবস্থাপক এমদাদুল হক। দখলে থাকা জমির স্বত্ব-মালিকানা প্রসঙ্গে তাঁরা জানান, ক্রয়সূত্রে এ জমির মালিক সাকা চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান কিউসি প্রপার্টিজ। কিন্তু জমি কিভাবে কেনা হয়েছে, সেই দলিলপত্র ও রেকর্ড-পর্চা দেখতে চাইলে পরে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়। পরে একাধিকবার যোগাযোগ করেও সেসব কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত জোট সরকারের সময় সাকা চৌধুরী প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করার পর প্রচার করেন, গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে শিল্প প্লট হিসেবে তা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেখানে ফ্ল্যাট নির্মাণের সাইনবোর্ড টাঙানোর বিষয়টি জানতে চাইলে কিউসির কর্মকর্তারা কোনো জবাব দিতে পারেননি।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'একজন যুদ্ধাপরাধীর দখল করা জমিতে তেজগাঁও থানা আনসার অফিস স্থাপনের বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর। একদিকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আদালতে সাকা চৌধুরীর বিচার হচ্ছে, অপরদিকে তাঁরই দখল করা সম্পত্তি রক্ষায় কাজ করছে আনসার!'
তেজগাঁও থানা আনসার ও ভিডিপি কর্মকর্তা শরীফ রেজানুল হক বলেন, বারবার চিঠি দিয়ে জানানো সত্ত্বেও ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে আনসার প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস সুবিধা না থাকায় বর্তমানে তাঁদের মানবেতর অবস্থায় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে বলে আনসার সদস্যরা জানান।
কিউসি প্রপার্টিজের মহাব্যবস্থাপক রতন মানিক রায় বলেন, জমিটি সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পারিবারিক কম্পানির জন্য মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে কেনা হয়েছে। তিনি এরশাদ সরকারের সময় গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জমিটি দীর্ঘ মেয়াদে বরাদ্দ নিয়েছিলেন। জমির রেকর্ড সূত্রে মালিক সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণা নেই। এটি সরকারের অধিগ্রহণ করা জমি বলে তিনি দাবি করেন। ব্যক্তিমালিকানা সম্পত্তি কিভাবে অধিগ্রহণ হলো এবং অধিগ্রহণের মামলা নম্বর কত, জানতে চাইলে তিনি এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বেগুনবাড়ী মৌজার বেশ কিছু জমি নিচু এলাকার অন্তর্ভুর্ক্ত ছিল। একসময় সেখানে ধান ও মাছের চাষ হতো, যার সঙ্গে তেজগাঁও শিল্প এলাকার কোনো সম্পর্ক নেই। বিগত এরশাদ সরকারের সময় নিচু জমিগুলো ভরাট করে বরাদ্দের নামে কিছু প্রভাবশালী লোক দখল করে নেয়।

মানুষের গ্রাস নিয়ে কাউকে চালবাজি করতে দেব না

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, 'যত দিন ক্ষমতায় আছি, মানুষকে খাবারের কষ্ট করতে দেব না। প্রয়োজনে সমস্ত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বন্ধ রেখে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব।' মিল মালিক ও আড়তদারদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, 'যারা সাধারণ মানুষের গ্রাস নিয়ে চালবাজি করবে, তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দেশের সব মিল মালিক ও আড়তদারের তালিকা আমার কাছে রয়েছে।

তাদের কাছে কত মজুদ আছে, এরা কী করে-না করে, কোন পন্থী_সে তথ্যও সংগ্রহ করছি।' এ সময় মজুদদার আইন পুনরুজ্জীবিত করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত ৩০ মিনিটের প্রশ্নোত্তর পর্বে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন সম্পূরক প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাসদের হাসানুল হক ইনুর প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা শেখ হাসিনা আরো বলেন, খাদ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়ার পর এত দাম বাড়ার কথা নয়। কিছু অসৎ ব্যবসায়ী আছে, তাদের কারসাজি রয়েছে।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে জিনিসপত্রের দাম কমে_এ দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, 'আওয়ামী লীগ এখন ৩৫-৩৬ টাকায় মোটা চাল খাওয়াতে পারছে। এখন বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে মানুষকে ৮০-৯০ টাকায় চাল খেতে হতো, এতে কোনো সন্দেহ নেই। ওরা ১০ টাকার চাল ৪০ টাকা করেছে। বাড়ানোই ওদের অভ্যাস। আর আমরা কমাই।'
পুঁজিবাজার দ্রুত পড়ে যাওয়াটা সত্যিই অস্বাভাবিক পুঁজিবাজারের চলমান অস্থিরতা নিয়ে বজলুল হক হারুনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'পুঁজিবাজারের ঘটনায় কিছু চক্র খেলা করছে, সন্দেহ নেই। আমরা তদন্ত করছি। পুঁজিবাজার কখনো উঠবে, কখনো পড়বে। এটাই স্বাভাবিক। তবে এত দ্রুত পড়ে যাওয়াটা সত্যিই অস্বাভাবিক।'
শেয়ার ব্যবসায়ীদের ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শেয়ারবাজার পড়ে যাবে এটা তারা কিভাবে জানল? বাজার পড়ে যাওয়ার পর ব্যানার নিয়ে রাস্তায় নেমে যাওয়া, ভাঙচুর চালানো ও অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করা দেখে সত্যিই সন্দেহ জাগে। কখন ব্যানার হলো? ভেতর থেকে কারা কী খেলছে?'
পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, শেয়ারবাজারে যারা কেনাবেচা করতে যাবে তাদের এই ঝুঁকি নিয়েই যেতে হবে_কখনো কমবে, আবার কখনো বাড়বে। দাম কমলে সঙ্গে সঙ্গে বিক্রি করা ঠিক হবে না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা উচিত। শেয়ারবাজার নিয়ে নিজের অনভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, 'আমি শেয়ারবাজার ততটা বুঝি না।'
ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শেয়ারবাজার স্থিতিশীল রাখতে যা যা করার দরকার, সরকার তা করছে। একটা তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত কমিটি কাজ করছে। সে কারণে অনেক কথা বলার থাকলেও বলা ঠিক হবে না। তাই এখন বললাম না। যা করার আমরা করে যাচ্ছি। কেন এমন হলো তা খতিয়ে দেখছি। কারা ভাঙচুর করল, এগুলোও খুঁজে বের করতে হবে।'
২০০৮ সালে তাঁর নির্বাচনী বক্তব্য নিয়ে বিরোধী দল অপপ্রচার চালাচ্ছে_এ অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'তারা প্রচারণা চালাচ্ছে, আমরা নাকি নির্বাচনের আগে ১০ টাকা কেজি চাল খাওয়ানোর কথা বলেছি। ওরা (বিএনপি) যখন চালের দাম ১৮-২০ টাকায় নিয়ে গিয়েছিল, ছিয়ানব্বই সালে সেটাকে ১০ টাকায় নিয়ে আসার কথা বলেছিলাম। ক্ষমতায় এসে আমরা পাঁচটি বছর চালের দাম ১০ টাকায় রেখেছি। পরে তারা ক্ষমতায় এসে সেই চাল ১০ টাকা কেজি ধরে রাখতে পারল না কেন? জনগণের কাছে তার জবাব দিতে হবে। তারা ১০ টাকা কেজি ধরে রাখতে পারলে তো এখন মানুষকে ৩৫-৩৬ টাকায় চাল খেতে হতো না। মানুষকে আজ কষ্ট পেতে হতো না।'
চালের দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে খেলা চলছেই_মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় চালের দাম ছিল ৪০-৪৫ টাকা কেজি। আমরা তা ১৮-২০ টাকায় নামিয়ে আনি। পরে কৃষকদের ন্যায্যমূল্যের কথা চিন্তা করে ২৫ টাকা করি। আমরা এক হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে চালের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছি। বেশি দামে চাল কিনে মানুষকে কম দামে খাওয়াচ্ছি।'
খাদ্যশস্যের বর্তমান মজুদ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "আমরা উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি মজুদ বাড়ানোর চেষ্টা করছি। মজুদ ঠিক রাখার লক্ষ্যে ভিয়েতনাম থেকে দুই লাখ, থাইল্যান্ড থেকে দুই লাখ, ভারত থেকে তিন লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করছি। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক টেন্ডারের মাধ্যমে সাড়ে চার লাখ মেট্রিক টন চাল ও ৪ দশমিক ৩৫ টন গম আমদানির উদ্যোগ নিয়েছি। মিয়ানমার ও রাশিয়া থেকে 'সরকার টু সরকার' চাল ও গম আমদানির আলোচনা চলছে। বর্তমানে আমাদের আট লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে। দুই লাখ মেট্রিক টন বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় আছে। জাহাজীকরণেও কিছু রয়েছে। সব মিলিয়ে ১২-১৪ লাখ টন চাল ও গম মজুদ হবে।"
এর আগে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ফজলুল আজিমের লিখিত প্রশ্নের উত্তরে সংসদ নেতা জানান, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকারের পদক্ষেপগুলোর মধ্যে হচ্ছে আন্তর্জাতিক মূল্য পরিস্থিতি এবং অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, চীনসহ বিভিন্ন রপ্তানিকারক দেশগুলোতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় বিবেচনায় রেখে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি খাদ্যশস্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মজুদ গড়ে তোলা হয়েছে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন বন্দরের মাধ্যমে পণ্যসামগ্রী খালাসের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন স্টকহোল্ডার যথাক্রমে ব্যবসায়ী সংগঠন, এফবিসিসিআই, পণ্যভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যৌথ ও পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আমদানিনির্ভর পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে মূল্য নির্ধারণ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বাজার মনিটরিং টিম নিয়মিত বাজার অভিযান পরিচালনা করছে। টিসিবির আইনি কাঠামো সংশোধন, জনবল বৃদ্ধি ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ডিও ব্যবস্থার পরিবর্তে ডিস্ট্রিবিউটরশিপ পদ্ধতি প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

মহাস্থানগড় রাতের আঁধারে তছনছ

কয়েক দফায় আদালত নিষেধাজ্ঞা দিলেও বগুড়ার মহাস্থানগড়ে খননকাজ বন্ধ হয়নি। পুরাকীর্তি ধ্বংসও চলছে অবিরত। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিতে এখন রাতের আঁধারে সেখানে কাজ চলছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাতে মহাস্থানগড়ের মূল মাজার এলাকায় উঁচু স্থানের ওপর ১৪০০ থেকে ১৫০০ শতাব্দীর পুরনো পুণ্ড্র গেট 'পুণ্ড্র নগরীর প্রবেশদ্বার' এলাকায় ব্যাপক খোঁড়াখুঁড়ি করা হয়।

রাতে শ্রমিক লাগিয়ে মাজার উন্নয়ন কমিটির পক্ষে এই খননকাজ চালানো হয়। খননের সময় সেখানে অমূল্য ব্ল্যাক স্টোন, প্রাচীন ইট, টেরাকোটা, মূর্তির ভাঙা অংশ বেরিয়ে এলে সেগুলো পাশেই একটি স্থানে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়। গতকাল বুধবার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা মাটি খুঁড়ে নিদর্শনগুলো উদ্ধার করেন। তাঁরা জানান, রাত ১২টার পর শ্রমিক লাগিয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। মূল মসজিদ থেকে ১৫ ফুট দূরের এই অংশটি নামাজের স্থান হিসেবে গড়ে তুলতে সেখানে খননকাজ করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। অথচ ঐতিহাসিক এই স্থানটিতে সব ধরনের খননকাজ বন্ধ এবং ওই স্থানটি সংরক্ষণের জন্য হাইকোর্ট থেকে দুই দফা নির্দেশনা এসেছে।
প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সাইট পরিচালক রেজাউল করিম জানান, তিনি মাজার এলাকার দায়িত্বে রয়েছেন। সেখানে এর আগেও অন্ধকারে খননকাজ হওয়ায় প্রতিদিন রাত ১২টা পর্যন্ত তাঁকে ডিউটি করতে হয়। মঙ্গলবারও রাত ১২টা পর্যন্ত তিনি ডিউটি করেছেন। তখন সেখানে কোনো শ্রমিক ছিল না। তিনি চলে যাওয়ার পর গভীর রাতে শ্রমিকরা কাজ করে। কারণ সকালে এসে তিনি পুণ্ড্র গেটসংলগ্ন স্থানে বালি বিছানো দেখতে পান। পরে আশপাশের লোকজনকে (যাঁরা রাতে অবস্থান করেন) জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, সেখানে রাতে শ্রমিকরা খনন কাজ করেছে।
মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান (জিম্মাদার) নাহিদ সুলতানা কালের কণ্ঠকে জানান, অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, যারা খনন কাজ করেছে তারা প্রথমে চিন্তা করেনি সেখানে প্রাচীন পুরাকীর্তি থাকতে পারে। পুরনো নিদর্শন বের হয়ে আসতেই সেগুলো রাতেই সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। আগে খনন করা একটি গর্তের মধ্যে নিদর্শনগুলো মাটি চাপা দেয় তারা। গতকাল সকালে নতুন মাটি দেখে সন্দেহ হলে তারা মাটি সরিয়ে ব্ল্যাক স্টোন, প্রাচীন ইট, টেরাকোটা ও মূর্তির ভাঙা অংশ উদ্ধার করেন। এ ঘটনার পর থেকে মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। এ ছাড়া ঘটনাটি প্রকাশ না করতে তাঁদের মাঠকর্মীদেরও বিভিন্ন ভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে। তিনি জানান, বারবার খননের জন্য টার্গেট করা স্থানটির নিচেই লুকিয়ে আছে পুণ্ড্র নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ভবন। কারণ মূল মাজার ও মসজিদসংলগ্ন টিলার মতো উঁচু জমিটি মূল পুণ্ড্র নগরীর অংশ। এখানেই থাকতেন রাজা এবং তাঁর লোকজন। ফলে রাজপ্রাসাদ ও প্রশাসনিক ভবন এখানেই থাকার কথা। তবে জমিটি মাজার কমিটির হলেও এর প্রত্নতাত্তি্বক গুরুত্ব নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিভাগের। এখানে ইচ্ছে করলেই কেউ খোঁড়াখুঁড়ি কিংবা অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারবে না। কিন্তু তাঁদের লোকজনকে ভয়ভীতি দেখিয়ে রাতের আঁধারে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালানো হচ্ছে। নাহিদ সুলতানা জানান, তিনি ঘটনাটি দেখার পর এ ব্যাপারে শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তাদেরও বিষয়টি জানানো হয়েছে।
গতকাল সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুণ্ড্র নগরীর একেবারে হার্ডপয়েন্টে হজরত শাহ সুলতান বলখি (রা.)-এর মাজারের পশ্চিম পাশে ২০ ফুট বাই ১০ ফুট এলাকায় খনন কাজ করা হয়। রাতে খনন কাজ প্রত্যক্ষ করেছেন সোলেমান আলী। তাঁর বাড়ি ফরিদপুর জেলায়। তিনি জানান, রাতে শ্রমিকরা যখন কাজ করে তখন তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তখন জেনেছেন, উলি্লখিত স্থানে নামাজের জায়গা করার জন্য টাইলস বসানো হবে। এরপর বেশ কিছু পাথর ও ভাঙা ইটের অংশ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলতেও তিনি দেখেছেন। স্থানীয় ভিক্ষুক মোকারম বলেন, 'শুনিচনু এটি বলে আর কাম হবি না। কিন্তুক আত্রে ক্যামা কাম করিচ্ছে। তালে ব্যান কিছু একটা করবি। হামাকেরে একটা থ্যাকার জ্যাগা লাগবি। সেডা করলে ভালোই হলোনি।'
গর্ত খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের একজনের সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সে জানায়, রাতে সেসহ ১০ শ্রমিক কাজ করে। মজুরি নিয়েছে ২০০ টাকা করে। সে আরো জানায়, তাদের কাছে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা আড়াই হাজার বছর আগের নিদর্শনের কোনো দাম নেই। এ কারণে তারা ভেঙে ফেলছে অবলীলায়।
মহাস্থান মাজার উন্নয়ন কমিটির সদস্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ জানান, তাঁরা আদালতের নিষেধাজ্ঞা পেয়েছেন। কাজেই সেখানে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চালানোর প্রশ্নই ওঠে না। বাইরের কেউ এই কাজ করতে পারে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জিন্নাহ জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। কাজেই এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারছেন না। তবে উলি্লখিত স্থানটিতে তাঁরা বালি ফেলে রেখেছিলেন মসজিদের ভেতরে কাজ করার জন্য বলে তিনি স্বীকার করেন। মহাস্থান মাজার কমিটির সভাপতি বগুড়ার জেলা প্রশাসক ইফতেখারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি বিষয়টি জানেন না। কারা খুঁড়ল, এটা খুঁজে বের করতে শিবগঞ্জ থানার ওসিকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান।
উল্লেখ্য, এর আগেও কয়েক দফা মহাস্থানগড় এলাকায় খনন করে পুরাকীর্তি ধ্বংস করার কয়েকটি প্রতিবেদন কালের কণ্ঠে প্রকাশ করা হয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ে ঐতিহাসিক এই স্থানে নির্মাণ কাজ বন্ধ করাসহ মহাস্থানগড় সংরক্ষণ কমিটি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পরও ধ্বংসযজ্ঞ থামেনি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য মতে, অতি প্রাচীনকালে বগুড়ার মহাস্থানগড় একটি গুরুত্বপূর্ণ শাসনকেন্দ্র ছিল। এই স্থানটি ধর্ম, শিল্প, সংস্কৃতি ছাড়াও আন্তপ্রাদেশিক বাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দী থেকে খ্রিস্টীয় ১৫ শতক পর্যন্ত এই সমৃদ্ধ নগরী একটি সমৃদ্ধ জনপথ সৃষ্টি করেছিল। বেশ কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত স্থানটি বিখ্যাত মৌর্য, গুপ্ত, পাল, সেন এবং অন্যান্য হিন্দু সামন্ত রাজারা প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে গড়ে ওঠা এই প্রাচীন নগরের ধ্বংসাবশেষই এখন বগুড়া জেলার একটি গৌরবোজ্জ্বল সম্পদ।

Wednesday, February 09, 2011

সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য কমিটি মুবারকবিরোধীরা অনড়

টানা দুই সপ্তাহ ধরে চলা বিরোধী আন্দোলনের মুখে গণতান্ত্রিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারক। চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য সামনে রেখে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য একটি কমিটি করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

এ সত্ত্বেও তাঁর পদত্যাগের দাবিতে এখনো রাজপথ দখল করে রেখেছে বিরোধীরা। গতকাল মঙ্গলবার নতুন উদ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে তারা। নতুন সরকার পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার কৌশল হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গতকাল জাতির উদ্দেশে এক টেলিভিশন ভাষণে ভাইস প্রেসিডেন্ট ওমর সোলাইমান সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য মুবারকের কমিটি করার নির্দেশের কথা জানান। বর্তমান পরিস্থিতিতে সোলাইমানকে মিসরের রাষ্ট্রক্ষমতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলে অনেকেই মনে করছেন। সোলাইমান জানান, শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, 'বিরোধী নেতাদের সঙ্গে জাতীয় সংলাপে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে একটি কমিটি গঠন করারও নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট।'
ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদলের একটি রূপরেখা তৈরির উদ্দেশ্যে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক দল অথচ নিষিদ্ধ মুসলিম ব্রাদারহুডসহ বিরোধী দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন সোলাইমান। বিক্ষোভকারীদের ওপর কোনো দমন-পীড়ন চালানো হবে না বলেও জানান তিনি। তবে কাকে কাকে নিয়ে ওই কমিটি গঠন করা হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট করেননি তিনি। আর যেসব দল মিসরের রাস্তায় গত দুই সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের সবার প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়নি আলোচনায়। এর আগে পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করে মুবারক আগামী সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে দাঁড়াবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো বলছে, মিসরের বর্তমান সংবিধান অনুসারে কোনো নির্বাচনই নিরপেক্ষ হবে না।
মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের অবসানের দাবিতে টানা দুই সপ্তাহের আন্দোলন গতকাল তৃতীয় সপ্তাহে গড়াল। মুবারকের পদত্যাগের দাবিতে মঙ্গলবার দেশজুড়ে নতুন উদ্যমে বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দিয়েছে আন্দোলনকারীরা। এই আন্দোলনের নাম দিয়েছে তারা 'নীল বিপ্লব'। কায়রোর তাহরির স্কয়ারে গণসমাবেশ ক্রমেই বাড়ছে। আন্দোলনের দুই সপ্তাহ পূর্তি উদ্যাপন উপলক্ষে জোরালো বিক্ষোভের এই ডাক দেওয়া হয়। এরই মধ্যে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী তাহরির স্কয়ারে স্থায়ীভাবে অবস্থান নিয়েছে। অনেকেই তাঁবু খাটিয়ে, কেউ কেউ কম্বল মুড়ি দিয়ে রাস্তা বা ফুটপাত দখল করে আছে। অনেকে আবার সেখানে অবস্থান নেওয়া সেনাবাহিনীর ট্যাংকের ভেতরেও রাত কাটাচ্ছে। আন্দোলনকারীদের চাঙ্গা রাখার জন্য বিভিন্ন গ্রুপ গণসংগীত গাইছে। তাহরির স্কয়ারে বিশাল এক ব্যানার টানানো হয়েছে, যাতে লেখা_'জনগণ এই সরকারের অবসান চায়।' মুবারক পদত্যাগ না করা পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বে না বলছে তাহরির স্কয়ারে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা।
এদিকে দুই সপ্তাহ আটক থাকার পর ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলের কর্মকর্তা ভায়েল ঘোনিম সোমবার ছাড়া পেয়েছেন। মিসরের বেসরকারি চ্যানেল ড্রিম টিভিকে তিনি বলেন, 'আমি কোনো প্রতীক, নায়ক বা এ ধরনের কিছু নই। তবে আমার ওপর যা ঘটেছে তা অপরাধ। ঘোনিমের মুক্তিতে মুবারকবিরোধী বিক্ষোভ আরো জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।'
বেতন ভাতা বাড়াল সরকার
পরিস্থিতি আয়ত্তে নিতে এবং ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার এক নতুন কৌশল হাতে নিয়েছেন মুবারক। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ভাতা ১৫ শতাংশ বাড়িয়েছে তার নতুন সরকার। গতকাল মঙ্গলবার দেশের ব্যাংকগুলো খুলেছে। তবে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেয়ারবাজার বন্ধ থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রয়েছে। কায়রো, আলেকজান্দ্রিয়া ও সুয়েজে কারফিউ অব্যাহত রয়েছে। এ পরিস্থিতির মধ্যে গত সোমবার প্রথম পূর্ণ বৈঠক করেছে নতুন মন্ত্রিসভা। তবে সরকারের এ উদ্যোগ আন্দোলন কতটা প্রশমিত করতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সালিত আবদেল আজিজ নামের এক ইঞ্জিনিয়ার বলেন, 'আমরা তাঁকে (মুবারক) বিশ্বাস করি না। তিনি একজন মিথ্যাবাদী। অতীতেও তিনি বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি আমাদের বেতন ভাতা ১৫ ভাগ কেন ৬৫ ভাগও বাড়ানোর ঘোষণা দিতে পারেন। তাঁকে আমরা বিশ্বাস করি না। সূত্র : এএফপি, রয়টার্স।

আরব বিশ্বে গণতন্ত্রের লড়াই

আরব বিশ্ব বা মধ্যপ্রাচ্যে অসন্তোষ বহু বছরের। এ অসন্তোষের পেছনে বড় একটা কারণ গণতন্ত্রের অভাব ও স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো। গত শতাব্দীর পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে আফ্রিকা বা দক্ষিণ এশিয়ায় গণতন্ত্রের হাওয়া লাগলেও আরব বিশ্বে তা লাগেনি।

এর বড় দুটি কারণের একটি হলো_তেল বিক্রি করে পাওয়া পেট্রোডলার, যেটা আমরা সত্তরের দশক থেকে দেখছি। অন্য কারণটি হলো_স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধানদের ওপর আমেরিকার কর্তৃত্ব বা সমর্থন। আর এটা এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছিল যে, জনগণের অসন্তোষ প্রকাশের কোনো মাধ্যম ছিল না। কারণ পার্লামেন্ট গণতান্ত্রিক নয়, বিশেষ করে রাজতন্ত্রে তা একেবারেই ছিল না। মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটিকেও উঠে আসতে দেওয়া হচ্ছিল না। একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নজরদারির মধ্যে রাখা হচ্ছিল। এর ফলে জনমনে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল ক্ষোভ ও অসন্তোষ। আর এটাকে কাজে লাগিয়েছে মুসলিম জঙ্গিরা। এর একটি উদাহরণ আমরা দেখতে পাই নয়-এগারোতে। এখানে সৌদি আরবের অনেকে জড়িত ছিল, এমনকি ওসামা বিন লাদেনও সৌদি আরবের। তারা একই সঙ্গে নিজেদের সরকার ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল।
এভাবে আরব বিশ্বে গণতান্ত্রিক কাঠামোটিকে আটকে রাখার ফলে ইসলামী মৌলবাদী বা জঙ্গিরা এর সুযোগ গ্রহণ করল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারছিল একটি পর্যায়ে এসে তাদের স্বার্থ আর ভালোভাবে রক্ষিত হচ্ছে না, কারণ আরব বিশ্বের জনগণের মধ্যে আমেরিকাবিরোধী মনোভাব জেগে উঠতে শুরু করছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কায়রো ভাষণে মিসরের পরিবর্তনের কথা বললেন। কারণ মনে রাখতে হবে, ওবামা নিজেই পরিবর্তনের স্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি কায়রো ভাষণের এক জায়গায় বললেন, মিসরের জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা তার সঙ্গে তার (ওবামার) আ@ি@@@ক সমর্থন আছে। এটা তিনি বললেন, কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন আরব বিশ্বে দিন দিন আমেরিকাবিরোধী মনোভাব ভয়ঙ্কর রূপ নিচ্ছিল। আর এ মনোভাব আরব বিশ্বে প্রকট রূপে দেখা দিল যখন বিশ্বমন্দার ঢেউ গিয়ে লাগল। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোই কিন্তু বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো এবং আরব বিশ্বের তেলকে সামনে রেখে পেট্রোডলারকেন্দ্রিক যে স্বপ্ন অনেকের ছিল তা ভেঙে গেল।
আমরা দেখলাম, মন্দার কারণে তিউনিশিয়ায় অসন্তোষ বেড়ে গেল এবং ২৩ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বেন আলীকে জনগণ সৌদি আরবে পালাতে বাধ্য করল। এ অসন্তোষ শুধু মিসরে নয়, ছড়িয়ে গেল জর্দান, ইয়েমেন, সিরিয়াসহ পুরো আরব বিশ্বে। কারণ সেসব জনগণ দেখল তিউনিসিয়ার বিক্ষোভে সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করেনি, বেন আলী বা সেই রাষ্ট্রকাঠামোকে সমর্থন করেনি যুক্তরাষ্ট্র। তখন তারা বুঝতে পারল, জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা চালায়, তবে আরব বিশ্বে যে অবস্থা বিরাজ করছে তার পরিবর্তন আনা সম্ভব। এই উদাহরণটা মিসর বা কায়রোতে খুব কাজে দিয়েছে। কারণ জনগণ দেখল, হোসনি মুবারকও ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় আছেন, মিসরেও গণতন্ত্রের প্রচণ্ড অভাব এবং বিশ্বমন্দার প্রভাব পড়েছে। তাই তিউনিসিয়া থেকে মিসর এই শিক্ষাটিই নিল যে, কায়রোর তাহরির স্কয়ারে যদি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যায়, তবে বেন আলীর মতো হোসনি মুবারককেও বিতারিত করা সম্ভব এবং সামরিক বাহিনীও তখন মাঝামাঝি অবস্থান নেবে। ঠিক তা-ই ঘটল। টানা ১০-১২ দিনের বিক্ষোভের মুখে হোসনি মোবারক বলতে বাধ্য হলেন, আগামী সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি দাঁড়াচ্ছেন না। কিন্তু যখন তিনি এ ঘোষণা দিলেন, তখন জনগণ মনে করল, এই ঘোষণার অনেক দেরি হয়ে গেছে এবং হোসনি মুবারকের এই আশ্বাসটিও খুবই সামান্য। একটা হিসাবে দেখা যায়, এ আন্দোলনে তিন শ বা তার চেয়ে বেশি লোক মারা গেছে। তাই জনগণ মনে করছে, হোসনি মুবারককে বিশ্বাস করা যায় না, তাঁকে এই মুহূর্তে পদত্যাগ করতে হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, কায়রোতে যে বিপ্লবতুল্য আন্দোলন ঘটছে, এর বিপক্ষে গিয়ে যদি তারা পুরোপুরি হোসনি মুবারকের পক্ষাবলম্বন করে, তবে তাদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে।
এখন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যেহেতু বেশ কিছু সময় আছে, তাই তারা (যুক্তরাষ্ট্র) পরোক্ষভাবে বলল, হোসনি মুবারক যদি এখনই চলে যান, তো ভালো কথা। সে ক্ষেত্রে একটি ট্রানজিশনাল সরকার যেন থাকে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি, মিসরের পরিস্থিতি এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে হোসনি মুবারকের ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়াটা অবশ্যম্ভাবী। সেপ্টেম্বরে যাবেন না আগে যাবেন, তা নিয়ে এখন দরকষাকষি চলছে। এই দরকষাকষির মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম ব্রাদারহুডকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। যদিও একসময় তাদের ব্যান্ড করা হয়েছিল, তবু তাদেরকেই ডাকা হচ্ছে সমঝোতায় বসতে। বরাবরই কিন্তু মুসলিম ব্রাদারহুড বলে আসছিল, যতক্ষণ পর্যন্ত হোসনি মুবারক পদত্যাগ না করছেন, ততক্ষণ তারা কোনো নেগোসিয়েশনে যাবে না। কিন্তু রবিবার শোনা গেল, তারা আলোচনার প্রস্তাব মেনে নিয়েছে।
এখানে বলে রাখি, হোসনি মুবারক নির্বাচনে দাঁড়াবেন না_এটা যেমন বলেছেন, তেমনি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওমর সুলাইমানকেও নিয়োগ দিয়েছেন। আশা করা যাচ্ছে, ট্রানজিশন বিষয়ে সুলাইমানের একটা বড় ভূমিকা থাকবে। সুলাইমানের ডাকে ব্রাদারহুড আলোচনায় বসতে রাজি হয়েছে। বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, আলোচনায় বসার জন্য, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য ব্রাদারহুডের ওপর আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের চাপ রয়েছে। কারণ বেন আলীর মতো যদি মুবারককেও বিদায় নিতে হয়, তবে অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরও টিকে থাকাটা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের বিক্ষোভ এখন পর্যন্ত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে যে তা ঘটবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ এরই মধ্যে জর্দানে আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে।
মিসরের উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে মুসলিম ব্রাদারহুড স্বাভাবিকভাবেই একটা ঝুঁকি নিয়েছে। এখন বোঝা যাবে, তাদের (ব্রাদারহুড) কাঠামোতে তারা কতখানি লাভবান হয়। মিসরে সেক্যুলার সিভিল সোসাইটি বলতে গেলে নেই, যা আছে সেটা মূলত ধর্মভিত্তিক সিভিল সোসাইটি; বিশেষ করে মসজিদ, মাদ্রাসা_এ ধরনের সিভিল সোসাইটি রয়েছে। আর এসব পরিমণ্ডলে ব্রাদারহুডের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক আছে। এই সাংগঠনিক নেটওয়ার্কটা নির্বাচনের সময় হয়তো তাদের কাজে দেবে, তারা হয়তো লাভবান হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে ব্রাদারহুড এই যে ঝুঁকিটি নিল, তাতে অন্য পার্টি বা এমন অনেক ব্যক্তির কথা আমরা শুনছি, যেমন এল বারাদির কথা। এই আলোচনা থেকে তাঁদের মধ্যে কে বা কারা শেষ পর্যন্ত লাভবান হবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রও চাইছে পরিস্থিতিটা যেন সামাল দেওয়া যায় এবং পরিবর্তনটা যেন একটু ধীরগতিতে হয়, যাতে করে তাদের স্বার্থটাও রক্ষা হবে আবার মুবারকও বিদায় নেবেন।
অন্যদিকে মনে রাখতে হবে, এরই মধ্যে মুসলিম ব্রাদারহুডের কাঠামোর ভেতরেও কিন্তু বড় ধরনের পরিবর্তন হয়েছে। এখন তারা গণতন্ত্র এমনকি বহুদলীয় গণতন্ত্রেও বিশ্বাস করে। জনগণের দাবি বা আকাঙ্ক্ষার কথা মাথায় রেখে ব্রাদারহুড এমন কিছু করবে না, যাতে করে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়।
এখন ইসরায়েল সম্পর্কে যা বলা যায় তা হলো, যেসব কারণে ইসরায়েল এত দিন পার পেয়ে যাচ্ছিল, তার সঙ্গে কিন্তু হোসনি মুবারকের এক ধরনের সম্পর্ক ছিল। মিসরে যদি গণতন্ত্র আসে, তার চাপ কিন্তু ইসরায়েলের ওপর পড়বে। তখন তারা কোনো না কোনো উপায়ে ফিলিস্তিনের সঙ্গে মীমাংসা করতে বাধ্য হবে। এই যে তারা বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে কোনো সমঝোতা না করে, তার পেছনে হোসনি মুবারকের স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো জড়িত ছিল। কারণ তার (মুবারক) সঙ্গে আবার যুক্তরাষ্ট্রের সুসম্পর্ক। তাই অন্য কথায় বলা যেতে পারে, মিসরের গণতন্ত্র ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গড়ার ব্যাপারটিকে ত্বরান্বিত ও সহায়তা করবে।
অন্যদিকে মনে রাখতে হবে, এ পরিস্থিতি থেকে ইরানও একটা সুযোগ নেবে; কারণ মিসরের সাথে ইরানের সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। তবে বিপ্লবের পরে ইরান যে রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি করেছে তার সঙ্গে মিসরের জনগণের আকাঙ্ক্ষার কোনো মিল নেই। কারণ মিসরের বিপ্লব একটি পার্টির অধীনে হচ্ছে না, কিন্তু ইরানে খামিনির চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করেই বিপ্লব হয়েছিল। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুডও এই অন্তর্বর্তী সময়ে সব পার্টির সমন্বয়ে ন্যাশনাল কোয়ালিশনের কথা বলছে। এখানে এককভাবে কিন্তু ব্রাদারহুড উঠে আসছে না। আর পুরো আন্দোলনটাই যে তারা করেছে সে দাবিও করতে পারছে না। ইরানের সঙ্গে মিসরের আরেকটি মৌলিক পার্থক্য আছে শিয়া-সুনি্নর বিষয়ে। সে হিসেবে মিসরীয়রা ততক্ষণই ইরানের সমর্থনকে গ্রহণ করবে, যতক্ষণ তা গণতন্ত্রের পক্ষে হয়।
মিসরে যখন লাখ লাখ লোক রাস্তায় নামল, তখনই যুক্তরাষ্ট্র এ আন্দোলনকে সমর্থন বা মিসরের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করল, তার আগে নয়। উপায় না পেয়েই যুক্তরাষ্ট্রের এই হস্তক্ষেপ। অথচ মুবারককে তো তারাই এত বছর ধরে ক্ষমতায় রেখেছে। যখন যুক্তরাষ্ট্র বুঝে ফেলল মুবারকের সময় ফুরিয়ে এসেছে, তখনই তাঁকে চলে যাওয়ার কথা বলতে শুরু করল। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা হলো।
এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির বিষয়ে বলতে হয়, স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ মিসরে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন। মিসরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেমে যাওয়ার ফলে তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যার কিছুটা প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ লাভবান হবে, যদি আরব বিশ্বে গণতন্ত্র আসে। কারণ অনেকেই মনে করেন, সেখানে যেসব প্রবাসী শ্রমিক থাকেন, তাঁদের তেমন কোনো মানবাধিকার নেই, নাগরিক অধিকার নেই, তাঁরা পরিবার নিয়ে সেখানে যেতে পারেন না। এই যে কতগুলো কাঠামো তৈরি হয়ে গেছে স্বৈরতন্ত্রের কারণে, গণতন্ত্র সত্যিকার অর্থে প্রতিষ্ঠিত হলে তা আর থাকবে না।
এতে কোনো সন্দেহ নেই, কায়রোতে যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আরব বিশ্বেই তার প্রভাব পড়বে। কারণ আরব বিশ্বে মিসরকে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক রাজধানী বলা হয়। তাই এখানে যদি সত্যিকার অর্থেই গণতন্ত্র আসে, তবে তা আরব বিশ্বে ছড়াতে বাধ্য। এটা গভীরভাবে লক্ষ করার বিষয় যে, কিভাবে এর সমাধান হচ্ছে। কেননা আরব বিশ্বের গণতন্ত্রের সঙ্গে আমাদের গণতন্ত্রও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ আমাদের প্রচুর প্রবাসী শ্রমিক আরব বিশ্বে রয়েছেন। আরব বিশ্বে গণতন্ত্র শক্তিশালী হলে বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বে তা ভালো মডেল হিসেবে দেখা দেবে।
ইমতিয়াজ আহমেদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক।