Thursday, February 10, 2011

পাট জিনোমের আঁতুড়ঘর by সমুদ্র সৈকত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবের যাত্রা শুরু ১৯৯৫ সালে। পাটের জিনোম আবিষ্কারের জন্য সিকোয়েন্সিং উপযোগী ডিএনএ তৈরি করা হয়েছিল এই গবেষণাগারেই। ৮৮-র বন্যায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কৃষকরা। পাটবীজশূন্য হয়ে পড়েছিলেন চাষিরা। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আনা নিম্নমানের বীজের কারণে পরের বছরও লাভের মুখ দেখেননি তাঁরা।

এ সময় ডিএনএর সাহায্যে পাটবীজ শনাক্ত করার কাজে এগিয়ে আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিনা খান। গবেষণা শুরু করেন সোনালী আঁশ নিয়ে। নিজ হাতে গড়ে তোলা মলিকিউলার বায়োলজি ল্যাবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চালিয়ে যান নিরলস গবেষণা। তাঁর হাতেই দেশে প্রথম পাটের জিন নিয়ে গবেষণা শুরু। ২০০০ সালে ডিএনএ ফিঙ্গার প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে পাটের জাত নির্ণয় করাই এ গবেষণাগারে পাওয়া প্রথম সাফল্য। এ ছাড়া 'টিস্যু কালচার অনির্ভর পদ্ধতি' উদ্ভাবন করে জেনেটিক ট্রান্সফরমেশনের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনাও সম্ভব হয়েছে এখান থেকে। ল্যাবপ্রধান অধ্যাপক ড. হাসিনা খান বলেন, 'এখন গবেষণা চলছে লবণ সহনশীল পাট উদ্ভাবন নিয়ে। এছাড়া পাটের আঁশের পুরুত্বের জন্য লিগনিন নামের যে উপাদানটি কাজ করে, সেটার পরিমাণ কমানো নিয়েও কাজ চলছে।'
গবেষণার জন্য পাটের নমুনা থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করা হয়। এ জন্য নমুনা টিস্যুকে নির্দিষ্ট রাসায়নিক দ্রব্যসহ বিক্রিয়া ঘটিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। এতে দ্রবণের ডিএনএর সঙ্গে কিছু অপদ্রব্য থেকে যায়। এ জন্য ফেনল, ক্লোরোফর্ম ও আইসো-অ্যামাইল অ্যালকোহল নামের রাসায়নিক যোগ করা হয়। এরপর তলানি সংগ্রহ করে তাতে ৭০ শতাংশ ইথানল যোগ করে বর্জ্য অপসারণ করা হয়। বিশুদ্ধ ডিএনএকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়।
নমুনাকে প্রাইমার, ডিএনটিপি, ট্যাক পলিমারেজ এবং অন্য উপাদানসহ পলিমারেজ চেইন রিঅ্যাকশন (পিসিআর) করা হয়। এর মাধ্যমে সামান্য পরিমাণ ডিএনএ থেকে সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটিয়ে বেশি ডিএনএ পাওয়া যায়। পিসিআর থেকে প্রাপ্ত কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ খণ্ডকে পরে জেল ইলেক্ট্রোফোরেসিস নামক একটি পৃথকীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করে আলাদা করা হয়।
নির্দিষ্ট আকারের কাঙ্ক্ষিত ডিএনএ ব্যান্ডকে রঞ্জিত করা হয়। এই রঞ্জক ব্যবহারের পর অতিবেগুণী রশ্মির মাধ্যমে ডিএনএ খণ্ডকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ সময় গবেষকরা নিরাপদ চশমা ব্যবহার করতে ভুল করেন না। ইদানীং এ কাজে জেলডক সিস্টেম ব্যবহারের ফলে গবেষণার কাজ আরো সহজ হয়েছে। ন্যানো ড্রপ ব্যবহার করে প্রতি মাইক্রোলিটারে কী পরিমাণ ডিএনএ আছে, তাও চট করে জান যাচ্ছে।
গবেষণার কাজে সব সময়ই বিশুদ্ধ পানির দরকার। ল্যাবের উন্নত ডিস্টিলড ওয়াটার প্ল্যান্ট সেই চাহিদা পূরণ করে। শিক্ষার্থীদের জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কাজ করার প্রয়োজন হলে ছুটে যান ল্যামিনার এয়ারফ্লো ক্যাবিনেটে। আর নমুনা জীবাণুমুক্ত করতে তাঁরা ব্যবহার করেন অটোক্লেভ মেশিন।
এ ছাড়া পাটের জিনোমে কোনো নির্দিষ্ট ডিএনএ খণ্ড আছে কি না কিংবা থাকলে এই খণ্ডের সংখ্যা কত, তা নির্ণয় করার জন্য সাউদার্ন ব্লট নামক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। কাঙ্ক্ষিত জিনের প্রকাশ ঘটছে কি না, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করার জন্য আছে নর্দার্ন ব্লট।
বর্তমানে পাটের জন্য উপকারী বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণের কাজ চলছে এই ল্যাবে। উন্নত জাতের পাট উদ্ভাবনের জন্য জেনেটিক ট্রান্সফরমেশনের মাধ্যমে বিশেষ জিনের প্রকাশ ঘটানোর কাজ এগিয়ে চলেছে।
এখানে মাস্টার্স, এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা গবেষণার সুযোগ পেয়ে থাকেন। আন্তর্জাতিক মানের এই ল্যাবে ছুটে আসেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগ, শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গবেষকরাও।
ল্যাব ম্যানেজার ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট সাজিয়া শারমিন জানান, আরো উন্নত গবেষণার জন্য ল্যাবে খুব শিগগিরই মাইক্রো-অ্যারে স্ক্যানার, রিয়েল টাইম পিসিআর মেশিন এবং টু-ডি জেল ইলেক্ট্রোফোরেসিস মেশিন সংযোজন করা প্রয়োজন।
'মলিকিউলার বায়োলজির গবেষণায় ধৈর্য প্রয়োজন'_জানালেন গবেষক রাজীব আহমেদ। শিক্ষার্থী নূরুন্নাহার ফ্যান্সি তাঁর গবেষণা কাজের ফাঁকে বললেন, 'গবেষণায় কোথাও আটকে গেলে বড় ভাইয়া ও আপুরা আগ্রহ নিয়ে দেখিয়ে দেন। শিক্ষকরা তো আছেনই।'
বাংলাদেশে পাট গবেষণার অন্যতম কর্ণধার ড. হাসিনা খানের নেতৃত্বাধীন এ মলিকিউলার বায়োলজি গবেষণাগারটির সুবাদেই হয়তো দেশের পাট গবেষণা এগিয়ে যাবে অনেক দূর। সেই সঙ্গে পুনরুজ্জীবিত হবে দেশের লুপ্তপ্রায় পাটশিল্পও।

দূষণ ঠেকাবে তিন অণুযোদ্ধা by তৌহিদ এলাহী

ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে প্রচুর ক্রোমিয়াম। প্রক্রিয়া শেষে এর কিছু উচ্ছিষ্ট চলে যাচ্ছে নদীনালায়, আর কিছু হচ্ছে পশুপাখি ও মাছের খাবার। এভাবে মানুষের দেহে ঢুকে যাচ্ছে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম, ঘটাচ্ছে ক্যান্সারসহ অনেক রোগ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক ও তাঁর গবেষক দল এমন তিনটি অণুজীব শনাক্ত করেছেন যেগুলো ওই বিষাক্ত ক্রোমিয়ামকে বানিয়ে দেবে পুরোপুরি নির্বিষ।

দেশে প্রায় ৩০০ ট্যানারি আছে। এর মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর ধারেই শতকরা নব্বই ভাগ চামড়া কারখানা। এগুলোতে প্রতিদিন গড়ে ২২০ মেট্রিক টন চামড়া প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৬০০-১০০০ কেজি উচ্ছিষ্ট পড়ছে নদীতে। কিছু কিছু আবার মুরগি ও মাছের খাদ্য এবং সার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় স্বাভাবিকভাবেই বিক্রিয়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয় প্রচুর ক্রোমিয়াম যৌগ, ক্রোম পাউডার, লিকার ইত্যাদি। এখান থেকে কোনোভাবে এই বিষাক্ত ক্রোমিয়াম মানুষের দেহে ঢুকে গেলে বা সংস্পর্শে এলে তৈরি হয় ক্যান্সারসহ বিভিন্ন রোগ। শ্বাস-প্রশ্বাস, খাদ্যদ্রব্য বা পানীয়ের মাধ্যমে মানুষের সংস্পর্শে এলে ত্বকের প্রদাহ, অ্যালার্জি, ক্ষত, অ্যাজমা ঘটায়। নাকের সেপ্টাম পর্দা ছিদ্র করে ফেলতে পারে এই ক্রোমিয়াম। শ্বাসনালি ও পাকস্থলির বিষক্রিয়াও ঘটায়। পাকস্থলি ও অন্ত্রের প্রদাহ, যকৃৎ এবং মূত্রনালির সমস্যা তৈরি করতেও এর জুড়ি নেই।
গবেষণা দলের সহকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ইফতেখার মো. রফিকুল্লাহ রোমান জানান, ক্রোমিয়াম মানবদেহের ক্রোমোজোমের সঙ্গে বিক্রিয়া করে ক্ষতিকর মিউটেশন বা পরিবর্তন ঘটিয়ে কোষের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি অর্থাৎ ক্যান্সার তৈরি করে। পাশাপাশি ক্রোমিয়ামযুক্ত চামড়া শিল্পের আবর্জনা জলজ পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে সেখানকার বাস্তুসংস্থানও নষ্ট করে। এর কারণে স্বাভাবিক অণুজীবের জীবনও বিপন্ন হয়। আর আমাদের চামড়া শিল্পের উচ্ছিষ্ট থেকে খাদ্য ও জৈবসার তৈরির প্রক্রিয়ায় বিজ্ঞানভিত্তিক পন্থাও অনুসরণ করা হয় না। ক্রোমিয়ামযুক্ত উচ্ছিষ্ট চামড়ার শতকরা ৫৩ ভাগের সঙ্গে কোনো যন্ত্রের সংস্পর্শ ঘটে না। সেগুলো থেকে খালি হাতেই তৈরি হচ্ছে মুরগি-মাছের খাবার। এর ধারাবাহিকতায় ক্রোমিয়াম ঢুকে যাচ্ছে শাকসবজিতে। পরে বিভিন্ন পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে মানুষের দেহে ঢুকে বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।
আগের এক গবেষণায় দেশের হাঁস-মুরগির খামার ও মাছের খাবারে ২.৪৯ শতাংশ ক্রোমিয়াম উপাদান পাওয়া গেছে। আর চামড়া শিল্প সংলগ্ন খালে ৪.০৬ পার্টস পার মিলিয়ন (পিপিএম) ঘনমাত্রায় এবং নদীতে ০.৪৪৩ পিপিএম ঘনমাত্রায় ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে।
অধঃক্ষেপণ, আয়ন বিনিময় ছাড়াও ক্রোমিয়াম দূষণ রোধে আরো কয়েকটি পদ্ধতি প্রচলিত আছে। তবে এগুলো সাশ্রয়ী নয়। প্রয়োজন প্রচুর রাসায়নিক বিক্রিয়ক ও জ্বালানি। এ কারণেই দেশে এগুলোর ব্যবহার চোখে পড়ে না। আবার পদ্ধতিগুলো অন্যভাবে পরিবেশের ক্ষতি করে। আর এ কাজে ড. মোজাম্মেল হকের গবেষণাপ্রাপ্ত অণুজীব ব্যবহার হবে সাশ্রয়ী ও শতভাগ পরিবেশবান্ধব।
রোমান জানান, চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম সাধারণত দু'ভাবে দ্রবণে মিশে থাকে। এর একটি ক্ষতিকর ও অন্যটি নিরীহ। এটিই গবেষণার মূল ভিত্তি। আবিষ্কৃত তিনটি অণুজীব হলো ইশেরিকিয়া, স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস, পেডিয়োকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস। এরা ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ নামের এক ধরনের এনজাইম বা উৎসেচক তৈরি করে। এই ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ এনজাইম ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামকে নিরীহ ক্রোমিয়ামে পরিণত করে।
এ গবেষণায় প্রথমে চামড়া শিল্প এলাকা সংলগ্ন খাল ও নদী থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। আর উচ্ছিষ্ট চামড়াজাত দ্রব্য থেকে প্রস্তুত খাদ্যের জন্য হাজারীবাগ, নিমতলীর প্রাণী ও মৎস্য খাদ্য তৈরির কারখানাগুলো থেকে নমুনা খাদ্য সংগ্রহ করা হয়। পানির নমুনা থেকে 'লুরিয়া বারটানি আগার' নামের বিশেষ ব্যবস্থায় ইশেরিকিয়া, স্টেফাইলোকক্কাস অরিয়াস এবং পেডিওকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস ব্যাকটেরিয়া তিনটি শনাক্ত করা হয়। পরে আরেকটি পরীক্ষার মাধ্যমে অণুজীবগুলোর উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। আর বিভিন্ন পর্যায়ে রাসায়নিক ও শারীরিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পর খাদ্য উপাদানগুলো থেকে অ্যাটমিক অ্যাবজর্বশন স্পেকট্রোফটোমিটার (এএএস) যন্ত্রের সাহায্যে ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি এতে ক্ষতিকর ক্রোমিয়ামের পরিমাণ ও ঘনমাত্রাও বের করা হয়। এরপর শনাক্ত করা ব্যাকটেরিয়াগুলো ক্রোমিয়ামযুক্ত নমুনায় প্রয়োগের মাধ্যমে এগুলোর কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। দেখা যায়, অণুজীব নিঃসৃত ক্রোমিয়াম রিডাকটেজ এনজাইমের প্রভাবে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম নিরীহ ক্রোমিয়ামে পরিণত হয়েছে। শনাক্তকারী তিনটি ব্যাকটেরিয়ার মধ্যে পেডিয়োকক্কাস পেন্টোসেসিয়াস সর্বোচ্চ কার্যকারিতা প্রদর্শন করেছে।
গবেষণা দলের প্রধান ড. মো. মোজাম্মেল হক জানান, এটি গবেষণার প্রাথমিক ধাপ। এটি শিল্প পর্যায়ে প্রয়োগের আগে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি চামড়া, খাদ্য ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট মহলের ভূমিকা রাখতে হবে।
এই গবেষণাকর্ম নিয়ে ইতিমধ্যে দুটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। 'বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ' এবং বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস প্রকাশিত তৃতীয় বাংলাদেশ-জাপান জয়েন্ট ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সের 'ফুড সেফটি অ্যান্ড হাইজিন' নামের বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত প্রবন্ধ দুটি ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ড. মো. মোজাম্মেল হকের এই গবেষণা দলে আরো ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অণুজীব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াস, শিক্ষার্থী শাহনেওয়াজ বিন মান্নান, বিজয়চন্দ্র দেবনাথ ও সফিউল ইসলাম।

সংযমী হতে হবে

শেয়ারবাজারে হঠাৎ করেই বড় ধরনের ধস নামে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তৈরি হয় আতঙ্ক। কিন্তু এ পরিস্থিতি সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমস্যা নয়। পরদিন অর্থাৎ সোমবারই দেখা গেছে, সূচক আবারও কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এখানে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নেওয়া রবিবারের কিছু সিদ্ধান্ত সহায়ক হয়েছে_এটা মনে করা যায়। এর পরও বিনিয়োগকারীরা আশ্বস্ত হয়েছেন_এমনটা বলার কোনো কারণ নেই। কিন্তু সত্যি হচ্ছে, বিনিয়োগকারীদের বিকল্প ব্যবস্থা সামনে না থাকার কারণে তাঁদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়ে গেছে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এসইসি এবং ডিএসইর সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের বিষয়টিও। বিনিয়োগকারীরা স্পষ্টত দায়ী করেছে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পরিবর্তনকে। এর ফলে চক্রবিশেষ অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পকেট থেকে।
এর পরও অধৈর্য হয়ে কেউ যেন শেয়ার বিক্রি না করেন_এমন পরামর্শ দিয়েছেন কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ। এ মুহূর্তে রাজপথে বিক্ষোভকারী বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধারণ করতে হবে। সরকারের নৈতিক সমর্থনও বাজারের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছুটা সহযোগিতা করতে পারে। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনের প্রতিটি পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের শান্ত কিংবা অশান্ত করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সেই বিবেচনা মাথায় রেখেই সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশনকে অধিকতর সতর্কতার সঙ্গে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে।
শেয়ারবাজারে দরপতন কিংবা দাম বাড়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এ প্রবণতা যদি ক্রমহ্রাসমান কিংবা ক্রমবর্ধমান হয়, তাহলেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা কিংবা আতঙ্ক তৈরি হতে পারে এবং এর পরিণতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনারও জন্ম হতে পারে। বর্তমানে বাজারে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, এর অন্যতম কারণ এটি।
যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে কিছু দিন আগেও এ বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর পরও নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি সম্পর্কে বাজারে নানা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেছে। তাঁদের দক্ষতা, এমনকি সততা নিয়েও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে, যা প্রায়ই তাঁরা ব্যক্ত করে থাকেন। কিন্তু সরকার এসব জানার পরও এসইসির কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। একই কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তাহীনতার জন্য সরকারকেও দায়ী করছেন। যদিও বাজারের ওপর সরকারের হাত খুবই সীমিত। শেয়ারবাজারের স্বাভাবিক রীতি অনুযায়ী ঝুঁকি কিংবা লাভ-লোকসানের হিসাবটা বিনিয়োগকারীকেই নিতে হয়। সেখানে সরকারের সার্বক্ষণিক খবরদারির বিষয়টি কাঙ্ক্ষিতও নয়।
এই দরপতনের প্রক্রিয়ায় ষড়যন্ত্রকারীদের হাত রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কথাও কেউ কেউ বলছেন। সরকার স্বপ্রণোদিত হয়েও সেদিকে নজর দিতে পারে। কারণ, হালে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নির্ভর করে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোতে নাশকতা চালানোর কথাও ব্যাপকভাবে শোনা যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, শেয়ারবাজারেও এমন কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর অস্তিত্ব আছে কি না তা-ও দেখার দায়িত্ব সরকারের। আর বিনিয়োগকারীদের মনে রাখতে হবে শেয়ারবাজার শুধু লাভেরই বাজার নয়, এখানে লোকসানও একটি স্বাভাবিক বিষয়। ব্যবসায়িক মানসিকতা পোষণ করলেই এই ক্ষোভ প্রশমিত হবে।

আশঙ্কা অমূলক নয়

বেশ কিছু দিন ধরেই এমন আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এবার প্রধানমন্ত্রীও সেই একই আশঙ্কা প্রকাশ করলেন। চট্টগ্রাম ইপিজেড এলাকায় কিছু দিন আগে বড় ধরনের গোলযোগ হয়েছে। গোলযোগ হয়েছে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায়। গার্মেন্ট সেক্টরে একের পর এক অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির পেছনে নাশকতার কোনো ছক থাকতে পারে_এমন আশঙ্কা অনেক দিনেরই।

সামান্য কারণেও গার্মেন্ট কারখানায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে গার্মেন্টে অগি্নকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। ঘটেছে প্রাণহানির ঘটনাও। এর পাশাপাশি ঝিনাইগাতী থেকে প্রায় ১৪ হাজার গুলি উদ্ধারের ঘটনা থেকে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ সারা দেশে এ ধরনের অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদের আরো বড় বড় মজুদ থাকতে পারে। সব মিলিয়েই দেশের বিরুদ্ধে নাশকতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও সেই আশঙ্কাই ব্যক্ত করেছেন। আশঙ্কা অমূলক নয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন অনেকাংশেই গার্মেন্টনির্ভর। আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যের অনেকটাই নির্ভর করে এই সেক্টরের ওপর। সেই সেক্টরে সম্প্রতি নতুন করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির একটা অপচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, তার পেছনে তিনি যুক্তিও দেখিয়েছেন। দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে নেতৃস্থানীয় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উপরন্তু মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের পুরনো আইনটি নতুন করে ফিরে আসছে। এ অবস্থায় দেশের ভেতরে থেকে একটি চিহ্নিত মহল যে সরকারকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার সব রকম চেষ্টা করবে, তাতে সন্দেহ নেই। পঁচাত্তরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্বাধীনতাবিরোধীদের স্বার্থ সংরক্ষণে অনেক কিছুই করা হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। গত ৩৫ বছরে নিজেদের অনেকখানিই গুছিয়ে নিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি। এর পাশাপাশি দেশের ভেতরে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটানো হয়েছে। চিহ্নিত একটি শক্তির সরাসরি সহযোগিতায় দেশে জঙ্গিবাদ শাখা-প্রশাখা বিস্তার করেছে। জঙ্গিবাদের পেছনে একটি চিহ্নিত মহল অর্থায়ন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় দেশে নাশকতার চেষ্টা যে রাজনৈতিক ধর্মান্ধগোষ্ঠী করতে পারে, এমন ভাবনা একেবারেই অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে ঝিনাইগাতী এলাকায় আবার গুলি উদ্ধারের ঘটনা রীতিমতো উদ্বেগজনক। এ এলাকায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনা তো এটাই প্রথম নয়। এর আগেও এ এলাকা থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০০৯ সালে ঝিনাইগাতীর পানবর এলাকা থেকে ১০টি আর্জেস গ্রেনেড উদ্ধার করা হয়েছিল। ২০০৭ সালে ঝিনাইগাতীর বাঁকাকুড়া এলাকায় একটি ঘরের মাটি খুঁড়ে প্লাস্টিকের ড্রামভর্তি ২৯ হাজার ১০০ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। ২০০৭ সালের ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ঝিনাইগাতীর গারো পাহাড় এলাকার বাঁকাকুড়া ও গজনী থেকে বিডিআর আরো ১০ হাজার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করেছিল। এসব অস্ত্রের পেছনে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের যেমন যোগসাজশ থাকতে পারে, তেমনি তাদের সঙ্গে বিশেষ সখ্যসম্পন্ন এ দেশের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোরও সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। পুুলিশ ও বিভিন্ন মহল থেকে এমনটাই সন্দেহ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন, সেটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। নাশকতা যে চলছে, তাতে কোনো সন্দেহ না রেখে এই নাশকতার নেপথ্যের অপনায়কদের চিহ্নিত করতে হবে। সারা দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের সর্বাত্মক তৎপরতা চালাতে হবে।

বলয় রহস্য by জুবায়ের হোসেন

শনির নাম শুনলেই মাথায় আসে গ্রহটাকে ঘিরে থাকা বলয়ের ছবি। সৌরজগতের বৃহস্পতি, ইউরেনাস ও নেপচুনেরও এমন বলয় আছে, তবে এরা শনির বলয়ের কাছে পাত্তা পায় না। কেননা শনির বলয়টা দৃশ্যমান ও দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এ সৌন্দর্যের পেছনের কাহিনী একেবারে নিষ্পাপ নয়। বলয় সৃষ্টির মূলে রয়েছে এক 'মহাজাগতিক হত্যাকাণ্ড'! মার্কিন গবেষকরা জানালেন, শনির এ বলয় তৈরির জন্য বহুকাল আগে ধ্বংস হয়েছিল অতিকায় এক উপগ্রহ।

এক সময় ভাবা হতো, শনি গ্রহের দুটি উপগ্রহ ধাক্কা লেগে কিংবা ধূমকেতুর আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছড়িয়ে যায়। ধীরে ধীরে ওই কণাগুলো গ্রহটির চারদিকে জায়গা মতো জেঁকে বসে। তবে নাসার অভিযানে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত ভিন্ন ধারণার ইঙ্গিত দেয়। কেননা বলয়টির ৯৫ শতাংশই বরফ। যদি উপগ্রহের খণ্ডে বলয় তৈরি হতো তবে এতে বরফের সঙ্গে অনেক বেশি পাথরকণা থাকার কথা। যুক্তরাষ্ট্রের সাউথওয়েস্ট গবেষণা সংস্থার তৈরি মডেল জানাল আরো চমকপ্রদ এ তথ্য। বলয় তৈরির সময় শনি সবে জমাট বাঁধতে শুর করেছিল। চারপাশ ঘিরে ছিল হাইড্রোজেন গ্যাসের মেঘ। এখনকার সবচেয়ে বড় চাঁদ টাইটানের চেয়েও বড় উপগ্রহ ছিল শনির। ভালোভাবে কক্ষপথে থিতু হওয়ার আগেই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি খাটিয়ে একটু একটু করে ওই উপগ্রহের বায়ুমণ্ডল থেকে বরফ কেড়ে নেয় শনি। আর ওই বরফেই তৈরি হয়েছে বলয়। শুরুর দিকে বলয়টা ছিল এখনকার চেয়ে ১০-১০০ গুণ বেশি পুরু। পরে ওই বরফের বলয়ে মিশে গেছে যৎসামান্য পাথরখণ্ড ও ধূলিকণা। আর ভর কমে আসায় ওই উপগ্রহ প্রবল বেগে শনির গায়ে আছড়ে পড়ে চূর্ণ হয়ে যায়। গবেষণা বলছে, বলয়ের মধ্যে হারানো বরফ থেকে তৈরি হয়েছে আরো অনেক ক্ষুদে উপগ্রহ।