Tuesday, July 26, 2011

তাহেরের হেরফের নেই! by কামরুল হাসান ও এম জে আলম

ইঞ্জিন, আসন, চাকা—কোনো কিছুই আগের মতো নেই। কাঠামোটা এখনো টিকে আছে। তবে রং চটে গেছে, ধরেছে মরিচা। লক্ষ্মীপুর মডেল থানা চত্বরে ১০ বছর ধরে পড়ে আছে মাইক্রোবাসটি। এটি বিএনপির নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার আলামত।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাইক্রোবাসটি নতুন করে আবার থানায় আগত মানুষের নজর কাড়ছে। তাহেরপুত্র বিপ্লবের ফাঁসির দণ্ড মওকুফের পর মামলার এই আলামতের মধ্যে এখন নতুন সন্ত্রাসের আলামত দেখছে এলাকার মানুষ। দিন কয়েক আগে নুরুল ইসলামের স্মৃতিস্তম্ভ ভেঙে ফেলা এলাকার মানুষের এই আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, এই মাইক্রোবাসে চড়েই দাপিয়ে বেড়াতেন লক্ষ্মীপুরের বিতর্কিত আওয়ামী লীগের নেতা আবু তাহেরের বড় ছেলে ফাঁসির আসামি এ এইচ এম বিপ্লব, পালিত ছেলে আবদুল জব্বার লাবু ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা। বিভিন্ন সূত্রের তথ্যমতে, ১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে ১০টি খুন ও এক ডজনের বেশি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে এই মাইক্রোবাস ব্যবহূত হয়েছিল। এই মাইক্রোবাস নিয়েই লক্ষ্মীপুর পৌর ছাত্রদলের নেতা মুনছুর আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন জুলফুর দুই হাতের সব আঙুল কেটে ফেলেন তাহেরের বড় ছেলে বিপ্লব। সেই মামলায় তাঁর সাজাও হয়েছিল।
কিন্তু এত দিন পরও এলাকাবাসী গণমাধ্যমের সামনে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। লক্ষ্মীপুরে এসে কয়েক দফা চেষ্টার পর দুই তরুণের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁরা কথা বলতে রাজি হন, কিন্তু ভয়ে ছবি তুলতে সম্মত হননি। এমন আতঙ্ক এখন লক্ষ্মীপুরজুড়ে।
আঙুল হারানো মুনছর প্রথম আলোকে শুধু বললেন, ‘রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহল থেকে যখন অবিচার হয়, তখন আত্মহত্যা করা ছাড়া আর উপায় থাকে না।’
বিএনপির নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলায় তাহেরের ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন আদালত। কিন্তু তাহেরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ করেন। নুরুল ইসলাম হত্যা মামলা ছাড়াও বিপ্লব আরও চারটি হত্যা মামলার আসামি। এর মধ্যে দুটিতে তাঁর যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। তিনি বর্তমানে লক্ষ্মীপুর কারাগারে আছেন। বিপ্লবের এই সাজা মওকুফ নিয়ে লক্ষ্মীপুরবাসীর মনে আবার আতঙ্ক ভর করেছে। সবার একই আশঙ্কা, বিপ্লব মুক্ত হলেই আবার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু হবে।
নিজের ছেলে বিপ্লবের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও সাজা মওকুফ হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তাহের বলেন, ‘বিপ্লবের নাম কে জানত, এখন সবাই তাকে চেনে। সে জেলা কমিটির (আ.লীগ) সদস্যও না। অথচ আজ প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, বিরোধী নেতা, ড. কামাল, সুরঞ্জিত সেন, মোহাম্মদ নাসিম—সবার মুখে মুখে তার নাম। টেলিভিশনে তাকে নিয়ে টক শো হচ্ছে। সে এখন জাতীয় নেতা। এক কোটি টাকা খরচ করেও এমন নাম পাওয়া যাবে না। ছেলেকে বলেছি, তুই এখন মরলেও আমি খুশি।’
তবে তাহেরকে নিয়ে জনমনে আতঙ্ক থাকলেও বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ কমই হয়েছে। কেবল মেয়র নির্বাচনের সময় তিনি বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রতিপক্ষের লোকজনকে বের করে দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাহের অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ—কেউ আমাকে ভোট দেয়নি। তারা আমার বিরোধিতা করেছে। পৌর নির্বাচনে আমি কারও কাছে ভোট চাইতেও যাইনি, লোকজন ভালোবেসে আমাকে ভোট দিয়েছে।’
লক্ষ্মীপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম সরোয়ার প্রথম আলোকে বলেন, এই সরকারের আমলে তাহের ও তাঁর ছেলেদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের হয়নি, যা আছে সব বিগত সময়ের অভিযোগ।
উন্নয়নকাজের নিয়ন্ত্রণ: স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর লক্ষ্মীপুর পৌরসভাসহ জেলায় যত সরকারি উন্নয়নকাজ হয়েছে, এর প্রায় সবই নিয়ন্ত্রণ করেছেন তাহের। এ ক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে সব দেখাশোনা করেছেন মেজো ছেলে এ কে এম সালাউদ্দিন টিপু। জেলা পরিষদ, শিক্ষা প্রকৌশল, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের যাবতীয় ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ তাঁরই হাতে। তাঁর কথামতোই সব কাজ ভাগ হয়েছে, সেভাবেই দরপত্রে ঠিকাদারেরা অংশ নিয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পৌর কাউন্সিলর অভিযোগ করেন, দরপত্র চাওয়ার আগেই বাস টার্মিনালের সীমানাদেয়াল নির্মাণের কাজ মেয়র তাঁর পছন্দের ঠিকাদারকে দিয়ে দেন।
তবে মেয়র তাহের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘কে আমার নাম কইছে, কন।’ লোকজন বলেছে, আপনার নামেই তো এসব হয়ে থাকে—এ কথার জবাবে তাহের বলেন, ‘ওই আমলে (বিগত আওয়ামী লীগ আমল) হয়ে থাকতে পারে। এবার আমি কোনো এক্সইএনকে (নির্বাহী প্রকৌশলী) একটি ফোনও করিনি।’
পরবর্তী লক্ষ্য সাংসদ হওয়া: এলাকার বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাহের এখন স্বপ্ন দেখছেন আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার। এর আগে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হতে চান। এরপর আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। এভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাহের। দল চার ভাগে বিভক্ত হলেও ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে তিনি নিজের পছন্দের লোকদের জিতিয়ে এনেছেন। তাঁদের মধ্যে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত দুই ইউপি চেয়ারম্যানও রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে।
নিজের ‘ভাবমূর্তি’ উজ্জ্বল করতে পৌরসভার বাজেট ঘোষণার সময় ৬৫টি খাসি কেটে ভোজ দিয়েছেন তাহের। বিএনপি-জামায়াতের নেতারা সেই ভোজে অংশ নিয়েছেন, বক্তৃতাও করেছেন। তাহের এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি পৌর মেয়র হিসেবে আমন্ত্রণ করেছি, এমপি হলেও আমন্ত্রণ করব।’
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র সাহাবুদ্দিন সাবু প্রথম আলোকে বলেন, তাহেরের লক্ষ্য আগামী সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া। তাই নিজের ভাবমূর্তি উদ্ধারে তিনি এটা করেছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এম আলাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, দলের কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত নেবেন, কে সভাপতি হবেন। কেউ চাইলেই তিনি সভাপতি হবেন, তা তো নয়।
সংসদ নির্বাচনের ইচ্ছা আছে কি না, জানতে চাইলে তাহের প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৌরসভা নির্বাচনের সময় মানুষের কাছে ওয়াদা করেছিলাম, আমি আর নির্বাচন করব না। কথা তো রাখতে হবে। তবে নেত্রী (শেখ হাসিনা) যদি চায়, তাহলে তো আমি আর না করতে পারব না।’

Saturday, July 23, 2011

নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাঃ বিপ্লবের নেতৃত্বেই অপহরণ ও খুন

লক্ষ্মীপুর পৌরসভার মেয়র আবু তাহেরের ছেলে এ এইচ এম বিপ্লবের নেতৃত্বেই বিএনপির নেতা ও আইনজীবী নুরুল ইসলামকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। তাহেরেরই বাসায় লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনাটির এই বর্ণনা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার রায়ে উল্লেখ রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন বিচারক এম হাসান ইমাম ২০০৩ সালের ৯ ডিসেম্বর মামলাটির রায় দেন। রায়ে বিপ্লব ও তাঁর ভাই আবদুল জব্বার ওরফে লাভুসহ পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড, বিপ্লবের আরেক ভাই টিপুসহ নয়জনকে যাবজ্জীবন এবং দুজনকে পাঁচ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়।
রায়ে শিমুল কুমার দেবনাথ নামে আসামির দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০০২ সালের ১৩ মার্চ লক্ষ্মীপুরের আদালতে দেওয়া ওই জবানবন্দিতে নুরুল ইসলামকে অপহরণের প্রস্তুতি থেকে লাশ টুকরো টুকরো করে বস্তায় ভরে মাইক্রোবাসে ওঠানো পর্যন্ত ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
২০০০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে নুরুল ইসলামকে লক্ষ্মীপুরের বাসা থেকে অপহরণ এবং পরে হত্যা করা হয়।
রায় ঘোষণার সময় চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) ছিলেন কামরুল ইসলাম। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এর আগেই রাষ্ট্রপতি একজন আসামির সাজা যেভাবে মওকুফ করেছেন, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা দেখা দিতে পারে।
দণ্ডিত আসামি যাঁরা: দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের রায়ে বিপ্লব ছাড়াও আবদুল জব্বার ওরফে লাভু (তাহেরের পালক ছেলে), আলমগীর হোসেন, জিকো, তানভীর হায়দার চৌধুরী ওরফে রিংকু ও জিয়াউর রহমান ওরফে শিপনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয় আবদুল খালেক, আবদুল গণি, পরাণ, জাকির হোসেন, মেহেদী, টিপু (তাহেরের আরেক ছেলে), মাহফুজ, মারজু ও শিমুলকে। এ ছাড়া পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড হয় দীনেশ ও দুলালের।
রায়ে যা বলা হয়: রায়ে বলা হয়, শিমুলের জবানবন্দি পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, ঘটনার রাত নয়টা থেকে ১১টার মধ্যে আসামি বিপ্লব, লাভু, জিকু, খালেক, গণি, রিংকু, পরাণ, জাকির, মেহেদী, টিপু, মাহফুজ ও মারজু গং তমিজউদ্দিনের মাঠের পেছনে ট্রাক শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যালয়ে বসে মদ পান করে। এরপর রাত ১২টার মধ্যে বিপ্লবের নেতৃত্বে আসামিরা মাহফুজের গাড়িতে করে নুরুল ইসলামের বাসায় যান। এর ৪৫ মিনিট পর ওই মাইক্রোবাসে করে তাঁরা নুরুল ইসলামকে তুলে আবু তাহেরের বাসায় নিয়ে আসেন। এরপর আসামি টিপু, লাভু, শিপন ও রিংকু আইনজীবী নুরুল ইসলামকে রামদা ও ছেনি দিয়ে কেটে টুকরো টকরো করেন। লাশের টুকরোগুলো দীনেশ, দুলাল ও শিমুলকে বস্তায় ভরার জন্য নির্দেশ দেন বিপ্লব ও লাভু। তাঁরা লাশের টুকরোগুলো বস্তায় ভরে মাহফুজের গাড়িতে ওঠান। এরপর লাশের বস্তা নিয়ে বিপ্লব, লাভু, জিকো, খালেক, গণি, রিংকু, শিপন ও মেহেদী ওই গাড়িতে করে মজু চৌধুরীর হাটের দিকে যান।
রায়ে বলা হয়, সাক্ষী ফাতেমা বেগম (নুরুল ইসলামের প্রতিবেশী) সাক্ষ্যে সুস্পষ্টভাবে বলেন, ঘটনার রাত ১২টা-সাড়ে ১২টার দিকে নুরুল ইসলামের বাসার সামনের কক্ষে বসে কাজ করা অবস্থায় হঠাৎ প্রথমে ফটক ভাঙার শব্দ শোনেন। বাইরে থেকে সন্ত্রাসীরা নুরুল ইসলামকে ঘর থেকে বের হতে বলে। নুরুল ইসলাম ভয়ে ঘরের ভেতর খাটের নিচে আশ্রয় নেন। সন্ত্রাসীরা দরজা ভেঙে সেখান থেকে তাঁকে বের করে নিয়ে আসে। এ সময় নুরুল ইসলাম তাঁকে হত্যা না করতে বিপ্লবকে অনুরোধ করেন। এরপর আসামিরা নুরুল ইসলামকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে দ্রুতগতিতে মাদামের (তাহেরের বাসা) দিকে যায়।
রায়ে বলা হয়, আরেক সাক্ষী নূর মোহাম্মদ পাটোয়ারী হলেন ফাতেমা বেগমের প্রতিবেশী। পাটোয়ারী সাক্ষ্যে বলেন, ঘটনার রাতে বিপ্লবসহ ৮-১০ জনকে নুরুল ইসলামকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে দেখেছেন। সাক্ষী হারুনুর রশিদও বলেন, তিনি দেখেছেন, নুরুল ইসলামের চোখ বেঁধে বিপ্লব, লাভু, জাকির, পরাণ, মেহেদী, জিকো, খালেক ও গণি নিয়ে গেছেন।
রায়ে বলা হয়, ‘উপরোক্ত সাক্ষ্য থেকে আসামি শিমুল কুমারের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঘটনার রাতে আসামি বিপ্লব, লাভু, জিকো, খালেক, গণি, রিংকু, পরাণ, জাকির, মেহেদী, টিপু, শিপন, মাহফুজ এবং অন্যান্য কর্তৃক নুরুল ইসলামকে তাঁর বাসা থেকে অপহরণের ঘটনাটি সুস্পষ্টভাবে সমর্থিত হয়েছে।’
যাঁরা খালাস পান: বিচারক রায়ে এই মামলার আসামি লক্ষ্মীপুর পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান আবু তাহের, তাঁর স্ত্রী নাজমা তাহের, ভায়রা হাসু চেয়ারম্যানসহ ১৫ আসামিকে খালাস দেন।
রায়ে বলা হয়, যদিও তাজুল ইসলাম নামের এক সাক্ষী বলেছেন, আবু তাহের, নাজমা তাহের, হাসু চেয়ারম্যান, বাবর, কাশেম জিহাদী গং নুরুল ইসলামকে অপহরণপূর্বক হত্যা করে লাশ গুম করেছেন। তাজুলের এই বক্তব্য সমর্থন করেছেন সাক্ষী রাশিদা ইসলাম, আইনজীবী মনিরুল ইসলাম ও কবিরুল ইসলাম। যদিও এই সাক্ষীদের জানার উৎস ছিলেন ফাতেমা বেগম। ফাতেমা বেগম স্বয়ং তাঁর সাক্ষ্যে এসব আসামির নাম উল্লেখ করেননি। সাক্ষী তাজুল, রাশিদা ইসলাম ও মনিরুল তদন্ত কর্মকর্তাদেরও এসব আসামির নাম ঘটনার পরপর বলেননি।
রায়ে বিচারক আরও বলেন, ‘আমার বলতে দ্বিধা নেই, রাষ্ট্রপক্ষ আসামি আবু তাহের, নাজমা তাহের, হাসু চেয়ারম্যান, সাজু, মাহবুব, মানিক, আবুল কাশেম জিহাদী, নুরুল আজিম বাবর, রিপন, সুমন, জামাল, কাজল, জাহাঙ্গীর, আবদুল মতিন ও জসিমউদ্দিন ওরফে সাংবাদিক জসিমের বিরুদ্ধে আনীত দণ্ডবিধির ১২০(বি)/৩০২/২০১/৩৪ ধারায় অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেনি।’
বিপ্লবের সাজা মওকুফের চিঠি বিচারিক আদালতের নথিতে সংরক্ষণ: বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ মওকুফ-সংক্রান্ত লক্ষ্মীপুর জেলা কারাগার কর্তৃপক্ষের চিঠি বিচারিক আদালতের নথিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক রবিউল হাসান গতকাল চিঠিতে ‘দেখিলাম’ লিখে এর নিচে সই করেন। এরপর তা নথিতে সংরক্ষণ করা হয়।
আদালত সূত্র জানায়, বিপ্লবের মৃত্যুদণ্ডাদেশ মওকুফ-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে কারাগার কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। লক্ষ্মীপুর কারা কর্তৃপক্ষ এ-সংক্রান্ত আদেশ ১৪ জুলাই কার্যকর করে। ওই দিন এ-সংক্রান্ত আদেশের চিঠি লক্ষ্মীপুর কারা কর্তৃপক্ষ বিচারিক আদালতে পাঠায়।
প্রথম আলোর রায়পুর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি জানান, নুরুল ইসলামের ভাই সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান শামছুল ইসলাম আজাদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন-চার দিন ধরে প্রতি রাতে নম্বরপ্লেটবিহীন মাইক্রোবাসে করে সন্ত্রাসীরা এসে আমাদের গ্রামের বাড়ির সামনে অবস্থান করছে। এতে আমরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি।’
যোগাযোগ করা হলে লক্ষ্মীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘নুরুল ইসলামের গ্রামের বাড়িতে রাতে সন্ত্রাসীদের আনাগোনা সম্পর্কে আমি অবগত নই। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Saturday, July 16, 2011

একটি ইট থামিয়ে দিল জীবন

অসুস্থ মাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি। মাকে দেখে হেঁটে আবার বাসায় ফিরছিলেন। কিন্তু নির্মাণাধীন ভবন থেকে ছুটে আসা একটি ইট থামিয়ে দিল তাঁর জীবনের চাকা। মাত্র ২১ বছরেই শেষ হয়ে গেল একটি সম্ভাবনাময় জীবন।

আজ শনিবার রাজধানীর পান্থপথে শমরিতা হাসপাতালের পাশে এ ঘটনা ঘটে। নিহত তরুণের নাম হাবিবুর রহমান। তেজগাঁও কলেজ থেকে এ বছর তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিলেন।
পুলিশ, প্রত্যক্ষদর্শী ও পারিবারিক সূত্র জানায়, হাবিবুর বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজধানীর পূর্ব তেজতুরী বাজার এলাকার একটি বাসায় থাকতেন। আজ তিনি তাঁর অসুস্থ মাকে দেখতে শমরিতা হাসপাতালে আসেন। সেখান থেকে দুপুর ১২টার দিকে বের হয়ে তিনি হেঁটে বাসায় যাচ্ছিলেন। এ সময় হাসপাতালটির বাঁ পাশে সাগুফতার ১৮ তলাবিশিষ্ট নির্মাণাধীন ভবন থেকে একটি ইট তাঁর মাথার ওপর পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান।
পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ওই ভবনের শ্রমিক মিজান হোসেন, জোনাথ, ইয়াকুব মিয়া, এবাদুল হক ও আশফাকুল ইসলামকে আটক করেছে।
নিহত তরুণের বাবা আবু কালাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে প্রথম আলোকে জানান, তাঁর দুই ছেলেমেয়ের মধ্যে হাবিবুর ছিলেন বড়। হাবিবুরের মা মঞ্জু আরা বেগম ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১০-১২ দিন ধরে শমরিতা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাঁরা বাবা ও ছেলে সময় ভাগ করে হাসপাতালে থাকতেন। তাঁরা দুজন হাসপাতালে আসেন। দুপুরের দিকে তিনি হাবিবুরকে বাসায় গিয়ে গোসল ও খাওয়াদাওয়া করে আবার হাসপাতালে আসতে বলেন। এ জন্য হাবিবুর বাসায় যাচ্ছিলেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘একটি ইট কেন কেড়ে নেবে আমার পরিবারের সব স্বপ্ন? কে এর জবাব দেবে?’
নিহত তরুণের ছোট খালা মাহিনুর জানান, হাবিবুর তেজগাঁও বিজ্ঞান কলেজ থেকে এসএসসি পাস করে তেজগাঁও কলেজে ভর্তি হন। সেখান থেকে এবার তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেন। মাহিনুর জানান, হাবিবুরের স্বপ্ন ছিল ফ্যাশন ডিজাইনার হবেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার ওসমানগঞ্জ গ্রামে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় লোকজন জানান, এর আগেও ওই ভবনটিকে ঘিরে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটেছে। মাস দুয়েক আগে ওই ভবনের এক শ্রমিক ওপর থেকে পড়ে মারা যান। ১৫-২০ দিন আগে একটি পাথরখণ্ড ওপর থেকে পড়েছিল। তবে কেউ না থাকায় হতাহত হয়নি। গতকালও ঘটনার সময় ভবনটির সামনে কোনো জাল ছিল না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সাগুফতার বিপণন ব্যবস্থাপক আবু শোয়েব খান বলেন, সাগুফতার ভবন থেকে ইট পড়েনি। পাশেই আরও একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। সেখান থেকে ইট পড়তে পারে। তা ছাড়া ১০ তলায় ভেতরের দিকে টাইলসের কাজ চলছিল। ইটের কোনো কাজ চলছিল না।
তবে সরেজমিনে দেখা যায়, সাগুফতার পাশের নির্মাণাধীন ভবনের নিচে কয়েকটি টিন দেওয়া থাকলেও সাগুফতার এমন কিছু ছিল না। সাগুফতার নির্মাণাধীন ভবনটির নিচে কয়েকটি শুকনো বাঁশের ওপর রক্তের দাগ দেখা গেছে। ভবনের বিভিন্ন তলায় অগোছালোভাবে ইটের স্তূপ, টাইলসের জিনিসপত্র, বিভিন্ন ধরনের পাইপসহ বিভিন্ন যন্ত্র বিশৃঙ্খলভাবে পড়ে ছিল।
শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জিয়াউজ্জামান জানান, সাগুফতা ভবনের ১০ ও ১১ তলায় কাজ চলছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ওই দুই তলার যেকোনো একটি থেকে ইটটি পড়তে পারে। ওসি জানান, ওই ভবনের সামনে নিরাপত্তা হিসেবে একটি নেট দেওয়া থাকলেও সেটি পর্যাপ্ত নয়। ভবন-মালিকদের গাফিলতির বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। এ ব্যাপারে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

Friday, July 15, 2011

কান্নাভরা স্মৃতিচারণা by প্রণব বল ও শারফুদ্দীন কাশ্মীর

অঝোরে কাঁদছে জেসমিন আক্তার। মাইক্রোফোনের সামনে কান্না চাপতে চোখ ও মুখে হাত চাপা দেয় সে। কান্নার শব্দ আসতে থাকে মঞ্চ ও সামনের দিক থেকেও। নিঃশব্দেও চোখ থেকে পানি পড়তে থাকে অনেকের। জেসমিন মিরসরাইয়ের আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। মিরসরাইয়ে গত সোমবার মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্রদের স্মরণে গতকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত শোকসভায় স্মৃতিচারণা করছিল সে। কিন্তু বারবার কান্না থামিয়ে দেয় তাকে। স্মৃতিচারণা করতে আসা অন্য শিক্ষার্থীরাও কেঁদেছে। কেঁদেছেন শিক্ষক-অভিভাবকেরা। স্মৃতিচারণা শুনে কেঁদেছেন সমবেত মানুষেরা।

এই শোকসভা হয় আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে। নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে উপজেলা পরিষদের তিন দিনের শোক কর্মসূচির শেষ দিন ছিল গতকাল।
সকালে প্রথমে হয় শোকযাত্রা। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সকাল ১০টায় স্কুল থেকে শুরু হয় শোকযাত্রা। আবুতোরাব ও আশপাশের এলাকা প্রদক্ষিণ করে এটি স্কুলমাঠে গিয়ে শোকসভায় মিলিত হয়। গতকালও ওই বিদ্যালয়ে ক্লাস হয়নি। ওই দুর্ঘটনায় সরকারি হিসাবে নিহত ৩৯ জনের মধ্যে ৩৭ জনই শিক্ষার্থী। এদের বেশির ভাগই আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্র।
বেলা সাড়ে ১১টায় শুরু হয় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আয়োজিত শোকসভা। এলাকার মতোই শোকের আবহ মাঠজুড়ে। কালো ব্যানারে শোকবার্তা। উপস্থিত সবার বুকে কালো ব্যাজ। মুখে শোকের গভীর ছায়া, যা কান্না হয়ে বেরিয়েছে স্মৃতিচারণার সময়।
শোকসভার শুরুতে ন্যাশনাল ব্যাংকের দেওয়া নিহত ছাত্রদের পরিবারপ্রতি ২০ হাজার টাকা অনুদানের চেক প্রদান করা হয়। এই চেক হাতে নিয়ে নিহত সাইদুলের মা জাহানারা বেগম বলেন, ‘আমার টাকার দরকার নেই। আমার সাইদুলকে এনে দাও।’
শোকসভায় নিহত সহপাঠীদের স্মৃতিচারণার সময় জেসমিনের মতো নুসরাত জাহান, তানভির হোসেন, সাইদুর রহমান, সৌরভ হোসেনরা কেঁদেছে। কেঁদেছে অন্য সহপাঠীরাও। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের সামলানোর চেষ্টা করে অন্যরা। কালো ব্যাজ ধারণ করে একসময় মঞ্চে ওঠে ওই দুর্ঘটনায় প্রাণে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন ছাত্র।
শোকসভার সভাপতি আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জাফর সাদেকও কেঁদে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রাণের যেসব শিক্ষার্থী হারিয়েছি, তাদের আমরা কোনো দিন ভুলব না। তবে এই শোক আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। সবাইকে আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানমুখী হতে হবে।’ তিনি অভিভাবকদেরও সহযোগিতা কামনা করেন। দুর্ঘটনার পর আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা দেওয়ায় তিনি সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ধন্যবাদ জানান।
বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ লকিয়ত উল্লাহ বলেন, ‘দুর্ঘটনায় এত প্রাণ চলে যাওয়া কেউ মেনে নিতে পারে না। আমরা নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’
বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোমিনুল হকের পরিচালনায় শোকসভায় আরও বক্তব্য দেন সহকারী প্রধান শিক্ষক জাহাঙ্গীর কবির, শিক্ষক সমিতির সীতাকুণ্ড শাখার সভাপতি হাবিবুল্লাহ, চট্টগ্রাম উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক জানে আলম, প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ মো. নুরুল আবছার, মিরসরাই পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি উত্তম শর্মা, স্কুল পরিচালনা পরিষদের সদস্য সুভাষ নাথ, মফিজুল ইসলাম, গোলাম সরওয়ার, শিক্ষক সমীরণ বড়ুয়া, রবিউল হোসেন নিজামী প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, আমরা যেসব ছাত্রকে হারিয়েছি, তারা ভবিষ্যতে দেশকে নেতৃত্ব দিত। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য। আমরা আর এমন মৃত্যু চাই না। বক্তারা শিক্ষার্থীদের সাবধানতার সঙ্গে চলাফেরা করার পরামর্শ দেন।
সভার শুরুতে নিহত ছাত্রদের স্মরণে দোয়া মাহফিল ও নিহত অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রার্থনা এবং শেষে মিলাদ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। বেলা দুইটার দিকে শেষ হয় শোকসভা।
সর্বত্র শোক: মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া সড়ক দিয়ে ঢুকতেই দুই পাশে কালো ব্যানার। দুর্ঘটনাস্থল আবুতোরাবের সৈদালী এলাকার ওই ডোবায়ও কালো ব্যানারে শোকবার্তা। এর কিছুদূরে আবুতোরাব বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়ে কালো ব্যানার, শিক্ষার্থীদের সাদা পোশাকের সঙ্গে কালো ব্যাজ। মাইকে ভেসে আসে শোক কথামালা।
এলাকার দোকান, স্কুল-কলেজ, খেলার মাঠ, মিরসরাইয়ের প্রতিটি বাজার, উপজেলা পরিষদ—সর্বত্র উড়ছে কালো পতাকা। নিহত ছাত্রদের বাড়িতে বাড়িতে মাতম।
শোকাবহ পরিবেশে গতকাল নিহত ছাত্রদের কুলখানি ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারটোলা এলাকায় নিহত সূর্য নাথের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার শ্রাদ্ধানুষ্ঠান চলছে। কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন তার মা ডলি ও বাবা খোকন নাথ। ওই দুর্ঘটনা থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া সূর্যর বড় ভাই দশম শ্রেণীর ছাত্র শুভ নাথ বসে ছিল বিমর্ষ মনে।
আবুতোরাব উচ্চবিদ্যালয়ে যোগাযোগমন্ত্রী: বেলা দুইটার দিকে আবুতোরাব স্কুলে যান যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন। প্রধান শিক্ষকের কার্যালয়ে বসে শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে দুর্ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন। তিনি এ সময় সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনা রোধে যানবাহন চালানোর সময় চালকদের মুঠোফোন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। এ নিয়ে বুধবার একটি আইন প্রায় চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগির এটি মন্ত্রিপরিষদে উত্থাপন করা হবে।
মন্ত্রী আরও বলেন, লাইসেন্সবিহীন চালককে যে মালিক গাড়ি চালাতে দেবেন, সেই মালিকের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে নিহত ছাত্রদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও আহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি আশ্বাস দেন, নিহত শিক্ষার্থীদের ভাইবোনদের কেউ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চাইলে মন্ত্রীর নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে তাদের পড়ার ব্যবস্থা করবেন।

নূহার জন্য শোকগাথা by ওমর ফারুক

'মা, তুমি কক্সবাজার চলে এসেছ। একবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো তোমার প্রিয় কক্সবাজার। আমার কথা যেন বুঝতে পারছিল ও। গুলিতে তার ডান চোখটা বেরিয়ে গিয়েছিল। আমার চিৎকার শুনে সে বাঁ চোখ দিয়ে তাকাল। তখন যেন সারা দুনিয়াকে দেখে নিয়েছিল ওই একটি চোখেই, এক তাকানোতেই। শেষ পর্যন্ত চোখ খোলা রেখেই আমাদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যায় আমার প্রিয় সন্তান। আমার হৃদয়ের টুকরো।' বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো কম্পানির কর্মকর্তা মো. জহিরুল হক তরুণ।
মেয়ের বায়না ছিল কক্সবাজার বেড়াতে যাবে। গত ৩০ জুন কক্সবাজারের চকরিয়া এলাকা দিয়ে মাইক্রোবাসে যাচ্ছিলেন তাঁরা। হঠাৎ ডাকাতরা গুলি চালায়। একটি গুলি তরুণের বাঁহাত ভেদ করে তাঁর কোলে ঘুমিয়ে থাকা নুহার মাথায় আঘাত করে।
'নূহা প্রায় দিনই আমার বুকের ওপর ঘুমাত। মেয়ে সামান্য ব্যথা পেলেও সে ব্যথা যেন লাগত আমার গায়ে। আর সেই সন্তানের মৃত্যু হলো আমার কোলেই।' কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলেন জহিরুল হক তরুণ। 'ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করে আমার কোলে ঘুমিয়ে গিয়েছিল ও। কিন্তু আর জেগে দেখতে পেল না পৃথিবীর আলো। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি বাবার কোলে শিশুরা নিরাপদ। কিন্তু আমার কোলে থাকা অবস্থায় আমার মেয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছে। আমি কেন পারলাম না আমার প্রিয় সন্তানকে বাঁচাতে?' তরুণের কণ্ঠে হাহাকার।
নূহার মা মুনমুন ওরফে মুনও শোকে পাথর। তিনি কী বলবেন, কোনো ভাষাই যেন খুঁজে পাচ্ছিলেন না। শুধু বললেন, 'কোনো দিন গুলির শব্দ শুনিনি। সে দিন শুনলাম। আর সেই গুলিই কেড়ে নিল আমার সন্তানকে। এই কষ্ট কিভাবে সহ্য করব আমি।'
যেভাবে ঘটনা : তরুণ কালের কণ্ঠকে জানান, ৩০ জুন একটি মাইক্রোবাস ভাড়া নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি, তাঁর স্ত্রী মুনমুন, মেয়ে নূহা, বন্ধু রিপন, সহকর্মী জাফর ও রিপনের ছোট ভাই সাজ্জাদ ও আজাদ। বিকেল ৩টার দিকে তাঁরা ঢাকা থেকে রওনা দেন। ওই দিন ছিল প্রচণ্ড বৃষ্টি। রাস্তার অবস্থা খারাপ হওয়ার কারণে গাড়ি খুব দ্রুত যেতেও পারছিল না। পথে মিরসরাইসহ কয়েকটি স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে যেতে আরো দেরি হয়। রাত হয়ে যাওয়ায় ও বৃষ্টির কারণে রাস্তার পাশের হোটেলগুলোও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে সবাই ক্ষুধার্তও ছিলেন সে দিন। চকরিয়ায় গিয়ে ভালো হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করবেন_এ চিন্তায় চালক জাকিরকে দ্রুত চালাতেও তাড়া দিচ্ছিলেন তরুণ। চট্টগ্রাম পেরোতে পেরোতে রাত দেড়টা বেজে যায়। পটিয়ায় গিয়ে মাইক্রোবাসে গ্যাস নেওয়ার সময় নূহা পেছনে তার মায়ের কোল থেকে গিয়ে বাবার কোলে ওঠে। তরুণ তাকে নিয়ে চালকের পাশের সিটে বসেন। কিছু দূর গিয়ে দেখতে পান একটি ট্রাক অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। যে কারণে সেখানে অনেক গাড়ি সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেকটা সময়। ক্ষুধার কথা বলে বাবার কোলেই একপর্যায়ে ঘুমিয়ে যায় নূহা।
সেই মুহূর্তটি : ডুলাহাজারার পর খুটাখালী মেদাকচ্ছপিয়া এলাকায় মোড় নেওয়ার সময় দেখা যায় রাস্তার ওপর গাছের ডাল ফেলে রাখা হয়েছে। তখন রাত ৩টার মতো বাজে। তরুণ সমূহ বিপদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে চালককে বললেন, ডালটি পেরিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার জন্য। চালক খানিকটা ধীর গতিতে ডাল পেরিয়েও যায়। ঠিক ওই সময় বিকট একটি শব্দ হয়। ভেঙে যায় গাড়ির গ্লাস। সবাই বুঝতে পারেন গাড়িতে গুলি করা হয়েছে। তীব্র ব্যথা অনুভব করে তরুণ বললেন, তাঁর বাঁহাতে গুলি লেগেছে। ঠিক তখন তাঁর বন্ধু রিপন চিৎকার করে উঠে বলেন, তোমার মেয়ের দিকে তাকাও। তরুণ দেখেন, নূহা কোলেই ঢলে পড়েছে। মাথা থেকে রক্ত ঝরছে। বুঝতে বাকি রইল না গুলি তাঁর হাত ভেদ করে মেয়ের মাথায় আঘাত করেছে। দ্রুত কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানেই নূহাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
তরুণ বলেন, 'আমি কী মনে করে মেয়ের বুকে চাপ দিয়েছিলাম। দেখলাম সে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছে। হাসপাতালে যখন চিকিৎসা দিচ্ছিল ডাক্তার তখন আমি চিৎকার করে বললাম, 'মারে তুমি কক্সবাজার চলে এসেছো। একবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখো। আমার মেয়ে যেন তখন আমার কথা বুঝতে পারছিল। সে বাঁ চোখ দিয়ে তাকায়। চোখ খোলা রেখেই আমাদের সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যায় সে।'
তরুণ বলেন, 'সেদিন যদি ডাল দেখে দাঁড়িয়ে যেতাম, তাহলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না। আমি আবার যদি সেই দিনটিতে ফিরে যেতে পারতাম।'
মর্মান্তিক এ ঘটনার পর মেয়ের লাশ নিয়ে তরুণ নোয়াখালী গ্রামের বাড়ি চলে যান। সেখানে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করে ফিরে আসেন ঢাকায়। ঘটনার পর থেকে তিনি ও তাঁর স্ত্রী স্বাভাবিক হতে পারছেন না। পুরো পরিবার বিপর্যস্ত। কান্না যেন তাঁদের সঙ্গী হয়ে গেছে।
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর হাতিরপুলের ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের ৩৭৩/১৭ নম্বর বাড়ির চতুর্থ তলায় গিয়ে দেখা গেছে তরুণ তাঁর মেয়ের পুতুল জড়িয়ে ধরে ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন। বন্ধু ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার ডা. তৌফিক জোয়ার্দার সান্ত্বনা দিচ্ছেন তাঁকে। কিন্তু কোনো সান্ত্বনাই তাঁকে শান্ত করতে পারছিল না।
বেড়ানো পছন্দ ছিল নূহার : তরুণ জানান, ২০০৭ সালের ৭ আগস্ট জন্মগ্রহণ করে নূহা। জন্মের পর তাকে নিয়ে চারবার কক্সবাজার বেড়াতে গেছেন। নূহা যখন বুঝতে শিখেছে, তখনই কক্সবাজারের কথা বলতেই খুব খুশি হতো। মেয়ের আনন্দ দেখার জন্যই তাঁরা কক্সবাজার যেতে আগ্রহী ছিলেন বেশি। তিনি জানান, ২৯ জুন রাতে নূহা ঘুমাতে পারছিল না। তখন তরুণ জানতে চান সে ঘুমাচ্ছে না কেন। জবাবে নূহা বলে, 'কাল কক্সবাজার যাব, এই আনন্দে ঘুম আসছে না। খুব আনন্দ লাগছে।' এই আনন্দই যে তার শেষ আনন্দ হবে সেটা কে জানত_বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তরুণ। আর তাঁর মুখ দিয়ে যেন কথা বেরোচ্ছিল না। শুধু তরুণ কেন, তাঁর বাসায় উপস্থিত তাঁর বন্ধু ডা. তৌফিক জোয়ার্দারেরও অশ্রু ঝরছিল।
চার ডাকাত গ্রেপ্তার : মর্মস্পর্শী এ ঘটনায় কক্সবাজার থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন তরুণের বন্ধু রিপন। পরে সেটিকেই এজাহার হিসেবে ধরে নিয়ে চকরিয়া থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। চকরিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ফরহাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ঘটনার দুই দিন পরই আমরা চার ডাকাতকে গ্রেপ্তার করেছি।' জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, তারা ১৬ থেকে ১৭ জন ডাকাতির উদ্দেশ্যে রাস্তায় গাছের ডাল ফেলে রেখেছিল। গাড়িটি ডাল পেরিয়ে চলে যাওয়ার কারণে গুলি করেছে। তিনি জানান, এই ডাকাতদের এর আগেও গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কয়েক মাস আগে জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও ডাকাতি শুরু করেছে। তিনি আরো জানান, তাদের অন্য সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।