Thursday, December 02, 2010

স্মরণ: শিক্ষাবিদ সেলিনা বাহার জামান

আজ ১ ডিসেম্বর ২০১০। ২০০৪ সালের এইদিনে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিসেবী সেলিনা বাহার জামান চৌষট্টি বছর বয়সে হূদরোগের চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। সেলিনা বাহার জামান ১৯৪০ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা হাবীবুলস্নাহ বাহার, মা আনোয়ারা বাহার চৌধুরী ও ফুফু বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ ছিলেন সে যুগের আলোকিত মানুষের প্রতিনিধি। বাবা-মার জ্যেষ্ঠ সন্তান সেলিনা বাহারের এক ভাই ইকবাল বাহার চৌধুরী ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সার্ভিসের প্রধান ও আরো তিন বোন শাহীন চৌধুরী-দেশের প্রথম মহিলা স্থপতিদের অন্যতম, অন্য দুই বোন নাসরীন শামস্ ও তাজিন চৌধুরী যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপিকা।
কলকাতায় প্র্যাট মেমোরিয়াল স্কুলে সেলিনা বাহারের স্কুলজীবন শুরু হয়, ৪৭-এর দেশ বিভাগের পরে ঢাকায় এসে কামরুন্নেসা স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৫৪ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা (ম্যাট্রিক) পরীক্ষায় পাস করেন। ১৯৫৬ সালে ইডেন কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দেন, ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিশুদ্ধ গণিতে এমএসসিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। অত্যন্ত মেধাবী সেলিনা বাহার ১৯৬১ সালে ইডেন কলেজের গণিতের প্রভাষক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৫ সালে বদরুন্নেসা কলেজে গণিতের সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন। ঐ বছরই প্রকৌশলী বদিউজ্জামানের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৭৭ সালে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজে গণিতের সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সাল থেকে ঐ কলেজেই গণিতের অধ্যাপক এবং পরবতর্ীতে বিভাগীয় প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করে ১৯৯৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

ঐতিহ্যবাহী পরিবারের উত্তরাধিকার-পারিবারিক আভিজাত্য ও খ্যাতিমান বাবা-মা'র সানি্নধ্যে ও অনুপ্রেরণায় সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় এবং লেখালেখিতে উদ্বুদ্ধ হন সেলিনা অল্প বয়স থেকে। তাঁর বাবা ও ফুফু চলিস্নশের দশকের মাঝামাঝি সময় কলকাতার 'বুলবুল' পত্রিকা প্রকাশনা ও 'বুলবুল' পাবলিশিং হাউজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেই সময়ে আধুনিক সাহিত্য ধারা সৃষ্টি এবং প্রধানত বাংলা সাহিত্যে আধুনিক মুসলিম সাহিত্যিকদের সাহিত্য চর্চা ও প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে দেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের অনেক কবিতা ও গান 'বুলবুল' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নন্দিত সাহিত্যিক শওকত ওসমানের জীবনের প্রথম লেখাও 'বুলবুল' পত্রিকায় ছাপা হয়। পরিবারের এই অনন্য ঐতিহ্য এবং সাহিত্যানুরাগ সেলিনা বাহারকে সংস্কৃতিসেবী, লেখিকা এবং কবি জনরুলের একনিষ্ঠ ভক্ত ও বিশেষ অনুরাগী করে তোলে। সেলিনা বাহার তাঁর নিজের লেখনির মাধ্যমে যেমন আমাদের সাহিত্য জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন তেমনি তাঁর দক্ষ সম্পাদনায় কাজী নজরুল ইসলামের দুটি বই আমাদের সাহিত্য ভাণ্ডারে অমূল্য সংযোজন নিঃসন্দেহে। একজন যোগ্য সম্পাদক হিসাবে ১৯৯৪ সালে বাংলা একাডেমী হতে তাঁর সম্পাদনায় 'নজরুল পাণ্ডুলিপি' এবং ২০০১ সালে নজরুল ইনস্টিটিউট থেকে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত অর্ধ সাপ্তাহিক 'নজরুলের ধূমকেতু' বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এবং নজরুল গবেষকদের কাছে একটি গাইড বিশেষ। সেলিনা বাহার পরবতর্ীতে হাবীবুলস্নাহ বাহার (১৯৯৫), জহুর হোসেন চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৬), আনোয়ারা বাহার চৌধুরী স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৭), শামসুদ্দিন আবুল কালাম স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৮), আব্দুল ওয়াহাব মাহমুদ স্মারকগ্রন্থ (১৯৯৯), শামসুন্নাহার মাহমুদ স্মারকগ্রন্থ (২০০০), বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন স্মারকগ্রন্থ (২০০২), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর তাঁর সম্পাদিত স্মারকগ্রন্থ 'আমায় তুমি অশেষ করেছ' (২০০৪) ইত্যাদি।

সেলিনা বাহার জামানের স্বামী এম বদিউজ্জামান বিসিআইসির অবসর প্রাপ্ত ডাইরেক্টর, পেশায় প্রকৌশলী। দুই ছেলে বড়জন পারভেজ জামান, পেশায় ডাক্তার যিনি ২০০১ সালের মার্চ মাসে লন্ডনে এক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ছোট ছেলে রিয়াজ জামান, কম্পিউটার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। তার স্ত্রী ও একটি কন্যা আছে।

তাঁর ষষ্ঠ মৃতু্যবার্ষিকীতে সকলের সাথে তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।

তারিক রহমান সৌরভ

কোপেনহেগেন হইতে কানকুন

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশসমূহের অন্যতম বাংলাদেশ। সোমবার মেক্সিকোর কানকুন জলবায়ু সম্মেলন শুরু হইয়াছে। আমরা বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবগুলি আমরা প্রত্যক্ষ করিতেছি। উহার প্রভাবে তাপমাত্রার ঊধর্্বগতি, হিমবাহ গলনাঙ্কের নিচে নামিয়া আসা হইতে শুরু করিয়া সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও দীর্ঘায়িত খরা মৌসুম উলেস্নখযোগ্য। যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তাহা হইলে, আমাদের গ্রহে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণ হইয়া দেখা দিবে।
মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত জলবায়ু সম্মেলন একটি সুন্দর ও ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি করিতেছে বলিয়া আশাবাদ ব্যক্ত করিয়া চলিয়াছেন অনেকে। অভিজ্ঞ মহলের অনেকে আবার হতাশ। তাহারা কোপেনহেগেনের সম্মত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের ওপরই বেশি গুরুত্ব দিতেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলা যায়, গত বৎসর কোপেনহেগেনে যে অগ্রগতি অর্জিত হইয়াছিল উহাকে অবশ্যই অধিকতর আগাইয়া লইয়া যাইতে হইবে কানকুনে। সেই সময়ের মূল বিষয়গুলির অসমাপ্ত আলোচনা। কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, গৃহীত কর্মসূচীর স্বচ্ছতা বজায়, অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি ও আমাদের বন সংরক্ষণ সমস্যা বিশেষভাবে উলেস্নখযোগ্য। এইসব বিষয়ে একটি 'ভারসাম্যপূর্ণ' ফলাফল খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। আমরা অবশ্যই প্রত্যাশা করিব, কোপেনহেগেনের অর্জনটুকুরও গুরুত্ব অনুবাধন করিবেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ।

'কোপেনহেগেন চুক্তি'র সংকল্পটিকে সম্মুখে রাখিয়াই নূতন করিয়া যাত্রা করিতে হইবে সকলের। ঐ চুক্তি হইতে দূরে সরিয়া গিয়া কোনো প্রকার 'বারগেইন' কিংবা দর কষাকষি করিয়া কালক্ষেপণ করা কাহারও জন্য কোনো সুফল বহিয়া আনিতে পারিবে না।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ১৪০টি দেশ কোপেনহেগেন চুক্তিতে স্বাক্ষর করিয়াছে। বিশ্বের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলি আন্তর্জাতিক মান ও মাত্রা বজায় রাখিয়া কার্বন নিঃসরণ কমাইয়া আনিবার কর্মকাণ্ডে অঙ্গীকারও করিয়াছে। কোপেনহেগেন চুক্তির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তথ্যাভিজ্ঞমহল বলেন, অর্থনৈতিক সাহায্য ক্ষতিগ্রস্ত দেশে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উন্নয়নে, অভিযোজনে ও বন সংরক্ষণে ব্যয় করা হইবে। জলবায়ুর কার্বন দূষণ বন্ধ করিতে না পারিলে সম্ভবত আগামী শতকে শিল্পোন্নত দেশগুলিও বিপন্ন হইবে। তখন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বও ভয়াবহ সংকটের সম্মুখীন হইবে। আমাদের সবুজ গ্রহটিকে সকলের জন্য বাসযোগ্য করিয়া রাখিতে কোপেনহেগেন চুক্তি ও কানকুনে জলবায়ু পরিবর্তন বৈঠক বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমষ্টিগত প্রয়াস ও প্রচেষ্টাকে সংহত করিবে, এমনটিই প্রত্যাশিত।

লাইসেন্সবিহীন চালক ও আমাদের বাস্তবতা

সরকারি হিসাবেই সারা দেশে লাইসেন্সবিহীন চালক রহিয়াছে সাড়ে চার লক্ষ। বেসরকারি হিসাবে এই সংখ্যা তিনগুণ। সরকারি সংস্থা বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, আমাদের দেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত পরিবহনের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৩ লক্ষ। ইহার বিপরীতে বৈধ চালকের সংখ্যা নয় লক্ষ। তবে অরেজিস্ট্রেশনকৃত পরিবহনের সংখ্যা কত তাহা জানা প্রায় অসম্ভবই বলা যায়। ইহা লইয়া কোন বাস্তবভিত্তিক গবেষণা হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। সুতরাং ভুয়া ড্রাইভারের প্রকৃত সংখ্যাটিও অজ্ঞাত।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের ৬১ ভাগ চালক বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই গাড়ি চালাইতেছেন। এই গবেষণাটিও সীমিত পর্যায়ের যাহার ফোকাস বা মূল কেন্দ্রবিন্দু হইল সড়ক দুর্ঘটনা। অবৈধ ও অদক্ষ গাড়ি চালক নিঃসন্দেহে সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু সরকারি হিসাবেই যেখানে কয়েক লক্ষ অবৈধ চালকের সন্ধান পাওয়া গিয়াছে, সেখানে এই পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে না কেন তাহা একটি বড় প্রশ্নই বটে।

বিআরটিএ'র পক্ষ হইতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারের বিরুদ্ধে বহুবার অভিযান চালাইয়াছে। চলতি বৎসরেও এই ব্যাপারে দুইবার অভিযান পরিচালিত হইয়াছে। কিন্তু তাহাতেও আশানুরূপ সাফল্য আসে নাই। বাড়ে নাই বৈধ চালকের সংখ্যাও। কারণ, গোড়ায় গলদ। মূল সমস্যায় হাত না দেওয়ায় সকল অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইয়াছে। বিআরটিএ ও পুলিশের ট্রাফিক বিভাগসহ সংশিস্নষ্ট সকলে বৈধ চালকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক তাহা আন্তরিকভাবে কামনা করে কিনা তাহাও বিবেচ্য। কেননা এক অনিয়মই অন্য অনিয়মের জন্ম দেয় বা তাহার সুযোগ তৈরি হয়। প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব সততার সহিত পালন করিলে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে গিয়া ভোগান্তি ও বিড়ম্বনার শিকার হইতে হইত না কাহাকেও। ড্রাইভিং লাইসেন্সপ্রাপ্তি যেমন সহজ করিতে হইবে, তেমনি জাল লাইসেন্স তৈরির কারখানায় পুলিশি অভিযানও অব্যাহত রাখিতে হইবে। তবে সবার আগে দক্ষ চালক তৈরিতে দেশে পর্যাপ্ত, মানসম্মত ও স্বীকৃত ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থাকা চাই।

রোগ অনুযায়ী ব্যবস্থাপনাপত্র প্রদান ও নিরাময়ের উদ্যোগ গ্রহণ করিতে না পারিলে কোন লাভ নাই। স্বাধীনতার পর অনেক রাস্তা-ঘাট হইয়াছে। তাহার সহিত পালস্না দিয়া বাড়িয়াছে যানবাহনের সংখ্যা। কিন্তু এজন্য যুগোপযোগী ব্যবস্থাপনা দরকার, সেদিকে তেমন কেহই নজর দেন নাই। আজ বিআরটিএ-কে একটি আধুনিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করিয়া ইহার জনবল অবশ্যই যৌক্তিক করিতে হইবে। যে কোন গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের সঙ্গে সঙ্গে তাহার বৈধ ড্রাইভার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকা উচিত। সর্বোপরি, সর্বত্র নিয়ম মানিয়া চলার অভ্যাস গড়িয়া উঠিলে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। আমাদের বক্তব্য হইল, নিয়ম মানাইতে হইবে এবং সেই সঙ্গে তাহা নিজেও মানিয়া চলিতে হইবে।

জীব বৈচিত্র্য : হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক লাঙ্গল

সৌরজগতে পৃথিবী নামক গ্রহেই শুধু প্রাণের স্পন্দন রয়েছে। জীবনের কোলাহল শুধু এ গ্রহেই শ্রুত হয়। পৃথিবী নামক গ্রহেই জীবনের অস্তিত্ব বিদ্যমান। যার জীবন আছে সেই তো জীব। জীব দুই ধরনের। যেমন- উদ্ভিদ ও প্রাণী। পৃথিবীর গহীন বন, মরুভূমি, ছোট-বড় বন-বাদাড়ে, মাটিতে জীব বসবাস করে। স্থানভেদে পরিবেশের বিভিন্নতায় ভিন্ন পরিবেশে ভিন্ন ভিন্ন প্রাণী বাস করে। কেউ স্থলে, কেউ জলে, কেউবা সমুদ্রে। আবার কেউ মন সুখে আকাশ পানে উড়াল দেয়। জলবায়ু ও পারিপাশ্বর্িক অবস্থায় বিভিন্ন প্রাণী বিভিন্ন পরিবেশে ওপর নির্ভরশীল। এরকম বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় প্রাণী নিয়েই প্রাণিজগৎ।
কীটপতঙ্গ, সরীসৃপ থেকে শুরু করে আমাদের পরিবেশে রয়েছে বিভিন্ন প্রাণী। কোনগুলো মানবহিতকারী পরিবেশ বান্ধব আবার কোনটি মানুষও পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে। যেমন- মৌমাছির মৌচাক থেকে মধু ও মোম পাওয়া যায়। রেশম পোকার গুটি থেকে রেশম পাওয়া যায় পাশাপাশি মশা, মাছি, উইপোকা আমাদের ক্ষতি করে থাকে। ফসলের জন্য ক্ষতিকর হলো পামরী পোকা, লেদা পোকা বিছা পোকা, ক্ষুদে মাকড় যেগুলো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে। এসবের ভিড়ে আমাদের জন্য একটি উপকারী ও পরিবেশ বান্ধব সরীসৃপ জাতীয় অ্যামিবা দলভুক্ত প্রাণী হলো কেঁচো। কেঁচো মাটির নিচে বাস করে। কেঁচো মাটির উর্বরা শক্তির জন্য এক বিরাট শক্তি। কেঁচো ফসলের জমিতে ওলট-পালট করে। যেমন উপরের মাটি নিচে ও নিচের মাটি ওপরে তুলে আনে। তাইতো কেঁচোকে "প্রকৃতির লাঙল" বলা হয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা ও জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধিতে কেঁচোর ভূমিকা অনন্য। তাছাড়া কেঁচোর তৈল থেকে ওষুধ তৈরি করা হয়। কেঁচোর বিষ্ঠা ফসলি জমির জন্য মহাউপকারী। গ্রামাঞ্চলে কেঁচোর তোলা মাটি ফোঁড়া উপশমে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু দিনকে দিন কেঁচো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। জলবায়ুর পরিবর্তন হেতু অনেক প্রজাতির অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন। তাছাড়া ফসলি জমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে কেঁচো। তাছাড়া এক শ্রেণীর মৎস্য শিকারী কেঁচোকে মাছের ' টোপ" হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা "বিষলং" গোটা, "রিডা বীজ"সহ অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ মিশিয়ে মাটির নিচে থাকা কেঁচো নিধন করছে। বর্ষা মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে প্রায়শই দেখা যায় কেঁচো নিধন দৃশ্য। তাই দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতির লাঙল কেঁচো। বিজ্ঞানীদের হিসেব মতে, সেদিন দূরে নয় ১১ হাজারেরও বেশি প্রজাতি বিলুপ্তির প্রহর গুণছে। এদের মধ্যে ৩০ শতাংশ মৎস্য এবং এক-চতুর্থাংশ স্তন্যপায়ী ও সরীসৃপ। বায়ুমণ্ডলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে কার্বনসহ অন্যান্য ক্ষতিকারক পদার্থ নির্গমন। মানব সৃষ্ট ঘনীভূত অমস্নজান মানুষ ও প্রাণীর জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ। পরিবর্তীত জলবায়ু ও মানব সৃষ্ট কারণে প্রতিদিনই আমরা হারাচ্ছি বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী। ফলে জীববৈচিত্র্যে চির ধরছে। প্রকৃতি হারাচ্ছে ভারসাম্য। আমাদের অস্তিত্বের জন্য, পরিবেশের অস্তিতের জন্যই আমাদের উচিত বিভিন্ন প্রাণিকূলকে বাঁচিয়ে রাখা। কেঁচো এমন একটি প্রাণী। যা আমাদের জমির উর্বরতা ধরে রাখতে উত্তম সহায়ক। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত উপকারী। অথচ আমরা সেদিকে খেয়াল না করে নির্বিচারে কেঁচোর অস্তিত্ব ধ্বংস করছি। আমরা বুঝতে পারছি না যে, নিজেই নিজের ক্ষতি করছি। এমনিতেই জমির উর্বর শক্তি দিন দিন কমে যাচ্ছে। এরপরেও যদি জমির উর্বরতা ধরে রাখার সহায়ক শক্তি প্রকৃতির লাঙল কেঁচো ধ্বংস করা থেকে আমরা বিরত না হই তবে সেদিন খুব দূরে নয়, যখন মাটি থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে মানবহিতকারী জীব কেঁচো। তাই প্রকৃতির লাঙল কেঁচো বাঁচাতে এখনই উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিদেশের কলাম : পাক-ভারত সম্পর্ক : একটি পর্যালোচনা নাথানিয়েন গ্রোনেউড

এক সময় সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম দখল করেছিল ইরাকের রামাদি, নাজাফ, সামারা ও বাগদাদ। বর্তমানে সে স্থানে উঠে এসেছে পাকিস্তানের লাহোর, রাওয়ালপিন্ডি, পেশোয়ার ও ইসলামাবাদ। কারণ প্রতিদিনই এসব শহর ছাড়াও দেশটির বিভিন্ন স্থানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্প্রতি সীমান্তবতর্ী উপজাতি অধু্যষিত এলাকায় অভিযান শুরু করেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সঙ্গে তালেবান ও পাঞ্জাবী জঙ্গিদের রয়েছে যোগসূত্র।
তাদের ধারণা আফগান সীমান্তে এক সময় যে জঙ্গিবাদের সূচনা তা এখন আর সেখানে সীমাবদ্ধ নেই। জড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। বস্তুত সে কারণেই যুক্তরাষ্ট্র হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেছে, চিরশত্রু ভারত নয়, পাকিস্তানের জন্য হুমকি সেদেশের সন্ত্রাসী চক্র। তাই পাকিস্তানিদের সর্বাগ্রে সন্ত্রাস তথা জঙ্গিদের ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ভারত সীমান্তের দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ রেখেছে। অবশ্য তার কারণও যে নেই তা নয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর ভারত ও পাকিস্তান তিন তিনটি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। তার মধ্যে দুইবারের যুদ্ধ কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে, যা পাকিস্তানিদের মনে আজো দাগ কেটে আছে। বিশেষ করে সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকায় বেশিরভাগ পাকিস্তানি সন্দেহ প্রকাশ করে থাকেন। তাদের ভাষায়, ঐসব যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-পাকিস্তানকে কেবলই দাবার গুটি হিসাবে ব্যবহার করেছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যে মুহূর্তে পাকিস্তানের সন্ত্রাস নিমর্ূলের জন্য মরিয়া ঠিক সে মুহূর্তে পাকিস্তানিদের অনেকেই আফগান যুদ্ধ ও নিজ দেশের সন্ত্রাস বিরোধী লড়াইকে দেখছে সে ফ মার্কিন সংগ্রাম হিসাবে সেটা যে তাদেরও লড়াই-সংগ্রাম তা মানতে রাজি নয় তারা। বরং আফগানিস্তানে ভারতের কনসু্যলেট অফিস খোলার বিষয়কে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা দেখছে অবিশ্বাসের চোখে, তাদের ধারণা, আফগানিস্তানে প্রভাব খাটানোর লক্ষ্যেই ভারত কাজটি করেছে। তাদের বোঝা উচিত সময় পরিবর্তন হয়েছে। এক সময় ভারত যদিও পাকিস্তানকে বিভক্ত করার কাজে সহযোগিতা করেছে, এখন আর তেমনটি চায় না। বরং পাকিস্তানে নৈরাজ্য সৃষ্টির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চিন্তিত ভারতও। বিশেষ করে মুম্বাইয়ের হোটেলে ও কাবুলে ভারতীয় দূতাবাসে বোমা হামলার ঘটনায় ভারত সন্ত্রাস নিমর্ূলে আরো বেশি জোরালো ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তাই পুরনো দিনের অনাস্থা-অবিশ্বাস ভুলে পাকিস্তান ও ভারতের উচিত সন্ত্রাস নির্মূলে একাট্টা হয়ে কাজ করা। এক্ষেত্রে আরো একটি বিষয় মনে রাখা দরকার-আফগানিস্তানের চেয়ে পাকিস্তানের গুরুত্ব বেশী। যুক্তরাষ্ট্র যদি ভারত ও পাকিস্তানকে তার আস্থাভাজন মিত্র বহাল রাখতে চায় তাহলে দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে পারে, একথাও মনে রাখতে হবে, কাজটি মোটেই সহজ নয়। কারণ কথিত ইসলামী জঙ্গীরাই এক্ষেত্রে প্রথম প্রতিবন্ধক, যা ভারত ও পাকিস্তানি নাগরিক কারোরই হালকা হিসাবে নেয়ার অবকাশ নেই।