Sunday, September 04, 2011

বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি সহজে দূর হচ্ছে না by তারিক হোসেন খান

সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এমনকি সাফটা চুক্তি সম্পাদনের পরও সার্কভুক্ত দেশগুলোর আন্তবাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যে চরম ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বৈধপথে ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ব্যবধান প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। ভারতে আমরা রপ্তানি করতে পারছি মাত্র দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার পণ্য। নেপাল-ভুটানে বাণিজ্যর ট্রানজিট আর ভারতের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার ঢাকাকে বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসে তেমন একটা সুখবর দেবে না। কেননা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে বাংলাদেশ চাহিদা অনুযায়ী ৪৭টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পেলেও ২০ মিলিয়ন ডলার বা এক হাজার ৪০০ কোটি টাকার পণ্য রপ্তানি সম্ভব ভারতে। তবে বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে চট্টগ্রাম-মংলা বন্দর আর ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট। আড়াই থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ এ খাত থেকে আয় করতে পারে। তার পরও থেকে যাবে বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি।
বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যগুলোর মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে তৈরি পোশাকসামগ্রী। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর ভারতে আট মিলিয়ন পিস তৈরি পোশাক শুল্কমুক্তভাবে রপ্তানি করার সুযোগ পেয়েছে। সম্প্রতি এ কোটা আরো দুই মিলিয়ন পিস বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য হতাশাজনক খবর হলো, পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির সুযোগ কম। উপরন্তু বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়িও ছোট। ভারত বিশ্বে আমদানি-রপ্তানি বিবেচনায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি রাষ্ট্র। মেশিনারি ও সামরিক সরঞ্জামের বিষয়টি বাদ দিলে ভারতের আমদানি খরচ বাংলাদেশের তুলনায় কম! দেশটির রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের রয়েছে সুনির্দিষ্ট ভিশন। প্রায় ৮০ কোটি কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সস্তা শ্রমবাজার ভারতকে বিশ্বে রপ্তানিমুখী করে তুলেছে। সুতরাং যুক্তিসংগত কারণেই বোধগম্য বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানির খুব একটা সুযোগ নেই ভারতে। তবে বাণিজ্য ব্যবধান হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে চট্টগ্রাম-মংলা বন্দর আর ট্রানজিট বা ট্রানশিপমেন্ট। ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আইকে গুজরাল বলেছিলেন, 'চট্টগ্রাম বন্দর আর ট্রানজিট দিয়ে বাংলাদেশ আড়াই হাজার কোটি টাকা আয় করতে পারে। রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক কারণে তা হচ্ছে না। ক্ষতিটা কার?' সময় এসেছে গুজরালের প্রশ্নটির চুলচেরা বিশ্লেষণের।
পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কৌটিল্য যুগে নেই। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী ভারতবর্ষের অন্যতম চিন্তাবিদ কৌটিল্য তাঁর ক্লাসিক অর্থশাস্ত্রে উল্লেখ করেছেন, পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র অবধারিতভাবে 'শক্ররাষ্ট্র'। সীমান্ত প্রসারণ/আগ্রাসন সমস্যা ছাড়াও পাশের দেশটির সঙ্গে সামরিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ থাকে প্রতি রাষ্ট্রের। কাজেই কৌটিল্যের মতে, সব দেশপ্রেমী রাজন্যবর্গের উচিত পার্শ্ববর্তী শত্রু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গোপনে ষড়যন্ত্র করা। সেই রাষ্ট্রে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা। কৌটিল্যের সূত্র অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রটির পাশের রাষ্ট্রটি হবে বন্ধু। কেননা শত্রুর শত্রু বন্ধু। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এ নীতি পাশ্চাত্যে অকেজো হয়ে পড়ে; বরং উল্টোটা প্রতিফলিত হয়। শত বছর ধরে যুদ্ধ করা ব্রিটেন-ফ্রান্স বন্ধুত্ব স্থাপন করে। হাজার বছরের দীর্ঘ রক্তাক্ত ইতিহাস ভুলে ইউরোপে কার্যকর হয় ইইউ (ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন)। ল্যাটিন আমেরিকায়ও এখন কৌটিল্যনীতি নির্বাসিত। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-কিউবা-ভেনিজুয়েলার নেতৃত্বে সেখানে এখন কার্যকর রয়েছে পশ্চিমা শোষণবিরোধী জোট। নাফটার মাধ্যমে নিজেদের অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশ সমাপ্ত করে উত্তর আমেরিকা অনেক আগেই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে কার্যকর সহযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের এ চলতি প্রবণতার বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চল সার্ক। নিজেদের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ সম্পন্ন করে দক্ষিণ এশীয় জোট। এর প্রধান কারণ ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ। তবে ভারতের সঙ্গে এর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদও এই প্রবণতা উসকে দিয়েছে। আশ্চর্য লাগে, বাংলাদেশের একশ্রেণীর স্বঘোষিত জাতীয়তাবাদী 'থিংকট্যাংক' কৌটিল্যনীতিকে আঁকড়ে ধরে ভারত বিরোধিতা করছে।
ট্রানজিট কিংবা ট্রানশিপমেন্ট অথবা কানেকটিভিটি স্থাপিত হলে রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্ব বিলুপ্ত হয় না। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সহযোগিতায় যে দ্বৈতনীতি প্রচলিত, তার মধ্যে শেষোক্তটি বাংলাদেশের জন্য বেশি কার্যকর। লাভজনক। নিরাপত্তার গ্যারান্টিসূচক। মনে রাখা জরুরি, দুটি অসম শক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতার ধারণা হাস্যকর। সক্রেটিসপূর্ব সফিস্ট গ্রিসে দার্শনিক থুকিডিসি স্পষ্ট করেই বলেছিলেন_'দুটি অসম শক্তির মধ্যে ন্যায়ের ধারণাই অন্যায়। ন্যায় হলো শক্তিমানের দণ্ড, ইচ্ছা, স্থিরকৃত নীতি।' নৈতিক প্রেক্ষাপটে থুকিডিসির সমালোচনা হলেও বৈশ্বিক রাজনীতিতে এ নির্মম সত্যকেই সমর্থন করেছেন 'রিয়েল পলিটিক' খ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মর্গেন্থু।
১৯৭৫ সালে ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে ভারত প্রথম পানি প্রত্যাহার শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশকে অনূ্যন ৪৪ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার কথা ছিল। পরে জিয়াউর রহমান সরকার ৩৪ হাজার কিউসেক পানির চুক্তি করে। ১৯৭৭-এর চুক্তিতে কোনো 'গ্যারান্টি ক্লজ' ছিল না। এপ্রিল মাসের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় ১০ দিন যখন গঙ্গায় পানিপ্রবাহ কমে যায়, তখন পানির কোনো নিশ্চয়তা ছিল না রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের চুক্তিতে। ১৯৭৫-এর রক্তাক্ত পটভূমি পরিবর্তনের পর গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে দিলি্লর সঙ্গে ঢাকার পানি সমস্যা শুরু হয়। গঙ্গা ইস্যুতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বিশাল রোডমার্চ হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের পানি সমস্যা দূর হয়নি। ভাসানী দিলি্লর ওপর চাপ প্রয়োগ করে এক ফোঁটা বাড়তি পানিও পাননি। দিলি্ল বিষয়টিকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। এরপর বিষয়টি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উত্থাপন করা হয়; কিন্তু ভয়াবহ সত্য হলো, ভারতের বিরুদ্ধে আমাদের কোনো বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রই নিন্দা প্রস্তাব আনেনি। এমনকি ইসলামী সম্মেলন সংস্থার (ওআইসি) কোনো মুসলিম রাষ্ট্র গঙ্গা ইস্যুতে সরাসরি বাংলাদেশকে সমর্থন করেনি। জেনারেল জিয়াকে আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বিষয়টি দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধানের পরামর্শ দেন। সাধারণ পরিষদ থেকে শূন্য হাতে ফিরে আশাভঙ্গের বেদনায় কাতর রাষ্ট্রপতি জিয়া ১৯৭৭ সালে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে ছোটেন দিলি্ল। পরে সাত্তার ও এরশাদ সরকার গঙ্গা চুক্তিতে আগ্রহী হলেও দিলি্ল ছিল নারাজ। খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম আমলে (১৯৯১-৯৬) গঙ্গায় পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। তিনি বিষয়টির আবারও আন্তর্জাতিকীকরণ করেন; কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে কোনো ফল আসেনি। আমাদের মনে রাখা জরুরি, বিশ্বদরবারে কোনো রাষ্ট্রই ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির গণতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন করবে না। বাস্তবিক পররাষ্ট্রনীতির কোনো হিসাব-নিকাশ তা কাম্য করে না। উপরন্তু ভারতের দক্ষ-রাজনীতিক-আমলারা আন্তর্জাতিক চাপ বা জনমতকে রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্ব দেয় না। কাশ্মির তার বড় প্রমাণ। জাতিসংঘ ১৯৪৭ সালে কাশ্মিরে গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব পাস করে; কিন্তু ভারত তা আমলে নেয়নি। সংক্ষিপ্ত এ আলোচনার একটিই সারকথা_সমস্যার আন্তর্জাতিকীকরণ করে ঢাকা বিশ্বদরবারে সহমর্মিতা বা করুণা পেতে পারে; কিন্তু মূল লক্ষ্য অর্জন হবে না। ঢাকাকে দিলি্লর সঙ্গে বৈঠকে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বন্ধুত্ব দিয়েই ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। নতুবা বাংলাদেশকে ক্রমাগত লোকসান গুনতে হবে। গঙ্গার ঘোলা পানি তার সাক্ষী। বিশাল রোডমার্চ আর জাতিসংঘে গিয়ে আমরা গঙ্গার পানি পাইনি। শেখ হাসিনা সরকার বন্ধুত্ব দিয়েই দিলি্লর হায়দরাবাদ দরবার থেকে পানি আনেন।
গেল বছর দিলি্লর হায়দরাবাদ হাউসে শেখ হাসিনা ও মনমোহন সিংয়ের আনুষ্ঠানিক বৈঠকের একদিন পর ১২ জানুয়ারি যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়। ৫০ দফার ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ দমন, ট্রানজিট, সীমান্ত বিরোধ ও ব্যবস্থাপনা, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, বাণিজ্য বৈষম্য, বাংলাদেশি ৪৭টি পণ্যের প্রবেশাধিকার, ঋণ সুবিধা, বিদ্যুৎ খাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বিষয় স্থান পেয়েছে। দিলি্ল বাংলাদেশের রেল কাঠামো, ব্রডগেজ ইঞ্জিন, বগি, রেলওয়ে কারখানা সংস্কার ও নদী পুনঃখনন প্রকল্পে ঋণ সহায়তা হিসেবে ১০০ কোটি ডলার দেবে। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে ভারত-বাংলাদেশ একে অন্যের সমুদ্র, রেল ও সড়কপথে ব্যবহার করবে। সহজ কথায়, ভারত তার দীর্ঘ চাহিদা অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দর ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সাত বোন রাজ্যের সঙ্গে বিকল্প সংযোগ স্থাপন ও বাণিজ্য সহজীকরণের লক্ষ্যে দিলি্ল চাহিদামতো ট্রানজিট রুট পেয়েছে। যৌথ ঘোষণায় সন্ত্রাসবাদ দমনে দুই দেশের সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিতে দিলি্ল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কেননা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী ছাড়াও এ অঞ্চলে বর্ধিষ্ণু উগ্র মুসলিম জঙ্গিরা ভারতের নিরাপত্তার একটি প্রধান হুমকি। বাংলাদেশের কিছু দুর্গম ভূখণ্ড এসব জঙ্গির স্বার্থে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ বিচারে দিলি্ল নিরাপত্তা ইস্যুতে চমৎকার এক গ্যারান্টি পেয়েছে।
ইন্দিরা ডকট্রিন থেকে গুজরাল ডকট্রিন (মতবাদ); ভারতের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহাসিক যে বিবর্তন, তার আলোকেই হাসিনা-মনমোহন ঘোষণায় বলা হয়েছে নেপাল-ভুটানে বাণিজ্য করতে ঢাকাকে ট্রানজিট দেবে দিলি্ল। একই সঙ্গে দিলি্ল ৪৭টি বাংলাদেশি পণ্যকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে। তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দেওয়ার কথাও বলেছে ভারত। আগামী ৬ সেপ্টেম্বর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরে এসবই চূড়ান্ত হওয়ার কথা। স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে স্মারক দিয়ে বাংলাদেশ এখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করতে অপেক্ষা করছে। দেখা দরকার 'উদীয়মান ভারত' কতটা উদার হয়।

তিন চুক্তি, পাঁচ এমওইউ, দুই প্রটোকল চূড়ান্ত

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় স্বাক্ষরের জন্য গতকাল শনিবার পর্যন্ত তিনটি চুক্তি, পাঁচটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও দুটি প্রটোকল চূড়ান্ত করেছে বাংলাদেশ। চূড়ান্ত হওয়া চুক্তি তিনটি হলো_ তিস্তা নদীর পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তী চুক্তি, ফেনী নদীর পানিবণ্টনে অন্তর্বর্তী চুক্তি ও ভারত থেকে ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি। এমওইউ পাঁচটি হলো_ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতা, মৎস্য খাতে সহযোগিতা, বিটিভি ও দূরদর্শনের মধ্যে সহযোগিতা এবং যৌথ বিনিয়োগে কয়লাভিত্তিক এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন। এ ছাড়া স্থল সীমানা ও বাঘ রক্ষায় পৃথক দুটি প্রটোকল স্বাক্ষরিত হবে। এর বাইরে পুরনো একটি প্রটোকলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত (অ্যাডাপ্ট) হবে রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রেল রুট।

গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। আজ রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সম্ভাব্য চুক্তি, এমওইউ ও প্রটোকলগুলো সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।
এদিকে সম্ভাব্য তিস্তা চুক্তি নিয়ে বিতর্ক এড়াতে এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো গতকাল ঢাকায় এসে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বৈঠক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন। পরশু মঙ্গলবার ঢাকায় আসছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং। গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের পর থেকেই ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক সফরের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ঢাকা। এ সফরে ভারতের সঙ্গে ১৪টি চুক্তি, এমওইউ ও প্রটোকল স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা থাকলেও গতকাল শনিবার পর্যন্ত ১০টি চূড়ান্ত হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ট্রানজিট নিয়ে ভারতের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আগ্রহ তিস্তা ও ফেনী নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিয়ে। এরই মধ্যে ট্রানজিট নিয়ে এ সফরে কোনো চুক্তি হচ্ছে না বলে মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তবু হিসাবে দেখা গেছে, ট্রানজিট নিয়ে কোনো সমঝোতা হলেও তা বাস্তবায়নে কয়েক বছর সময় লাগবে।
গতকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত হওয়া তিনটি চুক্তির দুটি তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টন ১৫ বছর মেয়াদি অন্তর্বর্তী চুক্তি। পুরনো একটি প্রটোকলের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা যে রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রেল রুট, সেটি ভুটানকে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার জন্য। শিবশঙ্কর মেনন আবারও ঢাকায় : কয়েক দিন ধরে তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে দুই দেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং পশ্চিমবঙ্গের মালদহ থেকে নির্বাচিত লোকসভার এমপি কংগ্রেসের আবু হাসেম খানের বক্তব্য নিয়ে ঢাকায় ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। এরপর গতকাল ঢাকায় অনুষ্ঠেয় যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) বৈঠক পিছিয়ে যাওয়ায় বিভিন্ন মহলে তিস্তা চুক্তি নিয়েই শঙ্কা দেখা দেয়। এই বিতর্কের অবসান করতে গতকাল বিকেলে ঝটিকা সফরে ঢাকায় আসেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশঙ্কর মেনন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে বৈঠক করেন। গত সপ্তাহেও দুদিনের সফরে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।
শিবশঙ্কর মেননের সফর সম্পর্কে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানান, মনমোহনের সফরের সার্বিক বিষয়ে আলোচনার জন্য তিনি আবারও ঢাকায় এসেছেন। ভারতের একজন এমপির উদ্ধৃতি দিয়ে বাংলাদেশকে তিস্তার পানির ২৫ শতাংশ দেওয়া হচ্ছে বলে যে প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, 'এটা হতেই পারে না। ৪৮ঃ৫২-ও হয়তো হবে না।' তিনি বলেন, 'ঘাবড়ানোর কিছু নেই, তিস্তা চুক্তিতে বাংলাদেশ লাভবান হবে।'
এদিকে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, শেষ পর্যন্ত তিস্তার পানি সমানভাবেই ভাগ করা হতে পারে। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। জেআরসির বৈঠক না হওয়া প্রসঙ্গে জানা গেছে, তিস্তা ও ফেনী নদীর পানিবণ্টনে প্রায় সব কিছু ইতিমধ্যে চূড়ান্ত হয়ে গেছে। ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকা সফর করবেন।
অন্যদিকে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের এবং পরে পররাষ্ট্রসচিব মোহাম্মদ মিজারুল কায়েসের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন অনুবিভাগের মহাপরিচালকদের বৈঠক হয়। জানা গেছে, ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফরকে সফল করার বিষয়ে বৈঠকগুলোতে আলোচনা হয়েছে। মনমোহনের সফরসঙ্গীরা : পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্ত্রী গুরশরণ কাউরকে নিয়ে ঢাকায় আসবেন। তাঁদের সঙ্গী হবেন বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী ভারতীয় পাঁচ রাজ্যের পাঁচ মুখ্যমন্ত্রী। তাঁরা হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগোই ও মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী লাল থানহাওলা। তাঁরা সবাই মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে নয়াদিলি্ল থেকে ঢাকায় আসবেন। এ ছাড়া ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস এম কৃষ্ণ, পানিসম্পদমন্ত্রী পবন কুমার বানসাল, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব টি কে এ নায়ার, পররাষ্ট্রসচিব রঞ্জন মাথাই, গণমাধ্যমবিষয়ক উপদেষ্টা ড. হারিস খারিসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ঢাকায় আসছেন। জানা গেছে, ৯৩ সদস্যের ভারতীয় প্রতিনিধিদলের মধ্যে থাকবেন ৬৪ জন সাংবাদিক। ঢাকায় মনমোহনের সফরসূচি : ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংকে বহনকারী ভারতীয় বিশেষ বিমান ঢাকা পেঁৗছাবে মঙ্গলবার সকাল ১১টা ৫৫ মিনিটে। বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দুপুর ১২টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে ১৯ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে সালাম জানাবে সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ওই সময় বিমানবন্দরে উপস্থিত থাকবেন। বিমানবন্দর থেকে দুপুর সোয়া ১২টায় মনমোহন সিংকে বহনকারী মোটর শোভাযাত্রা রওনা হবে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের উদ্দেশে। দুপুর ১টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে পেঁৗছে মনমোহন সিং এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী বীর শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর তিনি জাতীয় স্মৃতিসৌধ পরিদর্শক বইয়ে স্বাক্ষর করবেন এবং স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে গাছের চারা রোপণ করবেন। স্মৃতিসৌধ থেকে মনমোহন সিংয়ের মোটর শোভাযাত্রা রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে পেঁৗছাবে দুপুর ১টা ৫০ মিনিটে। তিনি সেখানেই দুপুরের খাবার খাবেন এবং বিশ্রাম নেবেন। বিকেল ৪টার পর মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে আলাদাভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ওই সাক্ষাৎ শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী যাবেন তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। অন্যদিকে মনমোহন সিংয়ের স্ত্রী গুরশরণ কাউর এ সময় গুরুদুয়ারা পরিদর্শন করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যাবেন এবং পরিদর্শন শেষে সোনারগাঁও হোটেলে ফিরবেন।
মনমোহন সিং তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পেঁৗছে সেখানে শিমুল হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আধা ঘণ্টার একান্ত বৈঠকে অংশ নেবেন। এরপর বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিট থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিট পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলন কক্ষ চামেলীতে চলবে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক বৈঠক। বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং এরপর একটি যৌথ ঘোষণা দেওয়া হবে। এরই ফাঁকে দুই প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে সুইচ চেপে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ উদ্বোধন করবেন। সন্ধ্যা ৭টায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী সোনারগাঁও হোটেলে ফিরবেন এবং রাত ৮টায় ওই হোটেলের গ্র্যান্ড বলরুমে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সম্মানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আয়োজিত নৈশ ভোজে যোগ দেবেন। নৈশ ভোজে দুই প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন। দ্বিতীয় দিন বুধবারের সফরসূচি অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী সোনারগাঁও হোটেল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হবেন সকাল পৌনে ১১টায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে সকাল ১১টা থেকে দুপুর পৌনে ১২টা পর্যন্ত তিনি 'ইন্ডিয়া, বাংলাদেশ, সাউথ এশিয়া' শীর্ষক বক্তব্য দেবেন। সেখান থেকে সকাল তিনি বঙ্গভবনে যাবেন দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে। সেখানে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে ১২টা ৫৫ মিনিটে তিনি ধানমণ্ডিতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে যাবেন। সেখানে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জাদুঘর পরিদর্শন এবং পরিদর্শক বইয়ে স্বাক্ষর করবেন। সোনারগাঁও হোটেলে ফিরবেন দুপুর দেড়টায়। দুপুরের খাবারের পর বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত বিশ্রাম নেবেন। বিশ্রামের ফাঁকে তাঁর সঙ্গে আলাদাভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর মনমোহন সিং হোটেল থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জান্তিক বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা হবেন। বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে বিমানবন্দরে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানাবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এভাবেই শেষ হবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ঢাকা সফর। আজ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন : ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরের প্রাক্কালে আজ রবিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি সফরের সার্বিক বিষয়গুলো নিয়ে সাংবাদিকদের জানাবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

Monday, August 22, 2011

মশার ওষুধের নামে ৫০০ ড্রাম পানি! by অমিতোষ পাল

গত ১৬ আগস্টের কথা। নগর ভবনের নিচতলায় ওষুধের মান পরীক্ষার আয়োজন করে ঢাকা সিটি করপোরেশন (ডিসিসি)। ১২টি মশারি টানানো হয়। একেকটি মশারির ভেতরে ৫০টি করে মশা ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর মশার ওষুধ ছিটানো হলো ভেতরে। কর্মকর্তারা আশা করেছিলেন ওষুধে ৮০ শতাংশ মশা কাবু হবে। কয়েক ঘণ্টা পর দেখা গেল, ৮০ শতাংশ তো দূরের কথা, দু-একটি মশা ছাড়া সব মশাই বেঁচে আছে। কিছু মশা অজ্ঞান হলেও পরে সেগুলোকে স্বাভাবিকভাবে উড়তে দেখা যায়। আর এই পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ধরা পড়ে প্রতারণার একটি ঘটনা। তিন কোটি ৪৫ লাখ টাকার মশা মারার ওষুধের কথা বলে ডিসিসিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে ৫০০ ড্রাম পানি।
বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ডিসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ দ্রুত ঘটনাস্থলে যান এবং তিনি সব ওষুধ জব্দ করার নির্দেশ দেন। ৫০০ ড্রাম থেকে পাঁচটি ড্রাম দৈবচয়ন ভিত্তিতে বাছাই করা হয়েছে। কয়েকটি মশারিরতে দু-চারটি মশা মরার বিষয়কে স্বাভাবিক কারণ হিসেবে মনে করেন মান পরীক্ষকরা। সে ক্ষেত্রে ওষুধের কোনো ভূমিকা নেই বলেই তাঁরা ধারণা করছেন। অ্যাগ্রো প্রডাক্টস নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এগুলো সরবরাহ করেছিল। ডিসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা এ এস এম শাহেন রেজা ওষুধ কেনার দায়িত্বে ছিলেন। গত মঙ্গলবার প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ে। দুই দিন পর বৃহস্পতিবার ডিসিসি এই ৫০০ ড্রাম তরল মশার 'ওষুধ' জব্দ করে। ড্রামগুলো ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পাশে অবস্থিত মশক নিবারণী দপ্তরে আটক রাখা হয়েছে। ঘটনার তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ডিসিসি।
জানা গেছে, পানির মধ্যে সামান্য ওষুধ মিশিয়ে কিছুটা গন্ধযুক্ত করে তা ভরা হয় ড্রামে। এরপর তা সরবরাহ করা হয় ডিসিসিকে। প্রতারণার বিষয়টি ধরা পড়ার পর এ নিয়ে নগর ভবনে চলছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, 'যাঁরা ঘটনাটি ধরতে পেরেছেন, তাঁরা ধন্যবাদের দাবিদার। এখন ঘটনার তদন্ত করে দেখা হবে কিভাবে ভেজাল ওষুধ ঢোকার ঘটনা ঘটল।' তিনি জানান, ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির সদস্যদের সুপারিশের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর ভেজাল ও মানহীন কোনো ওষুধ ডিসিসি নেবে না। প্রয়োজনে নতুন করে ওষুধ কেনা হবে।
জানা গেছে, চলতি বছরের গোড়ার দিকে ডিসিসি মশার ওষুধ কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ওষুধ সরবরাহের কাজ পায় লিমিট এগ্রো প্রডাক্টস নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। গত ৭ আগস্ট তারা ৫০০টি ড্রামে ১০ হাজার লিটার ওষুধ সরবরাহ করে। প্রতিটি ড্রামে ২০০ লিটার করে ওষুধ থাকার কথা।
প্রচলিত নিয়ম অনুসারে একটি মশারির খাঁচার মধ্যে কিছু মশা ছেড়ে দিয়ে তার ভেতরে ওষুধ স্প্রে করা হয়। ৮০ শতাংশ মশা মারা গেলে ওষুধকে মানসম্পন্ন হিসেবে ধরা হয়। এর আগে দৈবচয়ন ভিত্তিতে ড্রাম থেকে ওষুধ সংগ্রহ করা হয়।
ডিসিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ঠিকাদার যে দিন ওষুধ সরবরাহ করেন, ওই দিন সংরক্ষিত-১৩ আসনের মহিলা কমিশনার মাহমুদা ইসলামের মৃত্যুতে নগর ভবনে ছুটি ছিল। সেই সুযোগেই ঠিকাদার ড্রামে করে ওষুধের নামে পানি গছিয়ে দেন।
জানা গেছে, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন যাবৎ মশার ওষুধ কেনার আড়ালে ক্রয়বাণিজ্য করে আসছে। ঠিকাদার ও ভাণ্ডার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে এই প্রতারণা চলছে।
ভাণ্ডার বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এবারও ডেঙ্গুতে একজন চিকিৎসকসহ বেশ কয়েকজনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আর দোষ পড়ছে মেয়রের ওপর। নগরবাসী মনে করছেন, ডিসিসি মশার ওষুধ ছিটায় না। কিন্তু ওষুধ কেনার দায়িত্ব পালনকারীরাই যদি ভেজাল ওষুধ কেনে, তাহলে শত চেষ্টা করেও ডেঙ্গু ও মশক দমন করতে পারবে না ডিসিসি। তিনি মনে করেন, ওষুধের মান নিশ্চিত করতে না পারলে নগরীকে কোনোভাবেই মশকমুক্ত করা যাবে না।
ডিসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এই ভেজাল ওষুধের দাম ধরা হয়েছে প্রতি লিটার ৩৪৫ টাকা। অথচ প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান এসিআই বা অন্যান্য কম্পানির কাছ থেকে কিনলে এই 'এডাল্টিসাইড' ওষুধ পাওয়া যেত ১৯৫ টাকা দরে। এই মধ্যবর্তী অংশটা ওষুধ কেনার দায়িত্ব পালনকারী ও ঠিকাদাররা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
ওষুধ কেনার দায়িত্ব পালনকারী ডিসিসির প্রধান ভাণ্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা এ এস এম শাহেন রেজা কালের কণ্ঠের কাছে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেন, 'আমার ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ হবে না। বরং আপনি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারেন এইভাবে যে, এই জালিয়াতি আমরা ধরতে পেরেছি। এখন আমরা প্রয়োজনে ওই ওষুধ ফিরিয়ে দেব।' কিন্তু সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন কি না_এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'ওষুধ না নিলে এমনিতেই তো তার অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। তারপর আর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন নেই।'
ওষুধ সরবরাহকারী ঠিকাদার মিজানুর রহমান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, 'ডিসিসি ওষুধকে মানহীন বললেও কথাটা ঠিক না। কারণ হিসেবে তিনি মনে করেন, ওষুধ পরীক্ষা করার দিন ব্যাপক বৃষ্টি ও বাতাস ছিল। আর মশারির খাঁচাগুলো করা হয়েছিল নগর ভবনের নিচতলার বারান্দায়। এতে মশারির ভেতরে স্প্রে করা ওষুধ সহজেই বাতাসে উড়ে যায়। ফলে ওষুধের আর কার্যকারিতা জোরালো থাকেনি। বাতাসের কারণে মশার গায়ে ধোঁয়াও ঠিকমতো লাগেনি। তারপরও অনেক মশা মরেছে। তিনি দাবি করেন, ওষুধে পানি মেশানো হয়নি। অন্য দুটি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা করলেই সত্যতা প্রমাণিত হবে। তার আগে কেউ খারাপ বললে সেটা হবে আমাকে ক্ষতি করা।'
ডিসিসির এক কর্মকর্তা বলেন, এভাবে সরবরাহ করা ভেজাল ওষুধ রাজধানীতে ছিটানো হয়। ফলে মশা আর মড়ে না। আর এই সুযোগে লাভবান হয়েছেন কিছু কর্মকর্তা। তাঁরা ইতিমধ্যে ফ্ল্যাট-প্লটসহ বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন।

Saturday, August 20, 2011

মন্ত্রীদের ব্যর্থতায় নেতারা বিব্রত by জাহাঙ্গীর আলম

যোগাযোগমন্ত্রী ও নৌপরিবহনমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতা এবং বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ভার নিতে চায় না ক্ষমতাসীন মহাজোটের শরিক দলগুলো। এমনকি আওয়ামী লীগের নেতা-সাংসদেরাও এসব মন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে বিব্রত, ক্ষুব্ধ। মহাজোটের শরিকদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এই মন্ত্রীদের নিয়ে মহাজোট আরও বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে পারে। এ জন্য তারা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছে। যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ব্যর্থতা নিয়ে মহাজোটে ব্যাপক আলোচনা আছে। তাঁদের কর্মকাণ্ড, বক্তব্য ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতায় শরিক দলগুলো প্রকাশ্যেই সমালোচনামুখর।
এসব মন্ত্রীর পদত্যাগ চায় দলগুলো। মহাজোটের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের কারণেই তাঁদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত বলে মনে করেন দলগুলোর নেতারা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে দলে অসন্তোষ আছে। বিশেষ করে, মন্ত্রীদের পরস্পরের প্রতি দায় চাপানোর প্রবণতায় নেতারা বিব্রত। সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও বলছেন তাঁরা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ওবায়দুল কাদের প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী জনগণের অনুভূতির খবর রাখেন। দল মন্ত্রীদের ব্যর্থতার দায় নেবে না। নিশ্চয়ই প্রধানমন্ত্রী সময়মতো পদক্ষেপ নেবেন।
একইভাবে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এই কয়েকজন মন্ত্রীর ব্যর্থতা দল বা মহাজোটের ওপর বর্তায়। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে তাঁদের নিজে থেকেই চলে যাওয়া উচিত।’ ক্ষমতাসীন দলের আরও কয়েকজন সাংসদ এ ধরনের মন্তব্য করেছেন। তবে তাঁরা নাম প্রকাশ করতে চাননি।
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত দেশের যোগাযোগব্যবস্থার বেহাল অবস্থা। দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো বাস চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় মানুষ এখন চরম দুর্ভেঅগে রয়েছে। এটি এখন জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও যোগাযোগমন্ত্রীর ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় সংসদে সাংসদদের তোপের মুখে পড়েন যোগাযোগমন্ত্রী।
একইভাবে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান পরীক্ষা ছাড়াই সাড়ে ২৪ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছেন। অদক্ষ চালকদের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়লেও নৌমন্ত্রী তাঁর অবস্থানে অনড় রয়েছেন।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের দেশ পরিচালনার মেয়াদ পাঁচ বছর। চলার পথে গতি কখনো শ্লথ হবে, কখনো বাড়বে। একটা ত্রুটি হয়েছে, এটা আমরা কাটিয়ে উঠব।’
মহাজোটের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মহাজোটে আমরা রাজনৈতিকভাবে আছি। সরকার পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা নেই। এসব ব্যর্থ মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী দেখেশুনে ব্যবস্থা নেবেন।’
মেনন বলেন, আইনের প্রয়োগ ছাড়া কারও ইচ্ছায় গাড়ি চালানোর পেশাদার লাইসেন্স দেওয়া যায় না। আর সরকার যতই বলুক, পুলিশের বাড়াবাড়ির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে।
অপর শরিক জাসদের হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘মন্ত্রীদের দুর্নীতি, অদক্ষতা, ব্যর্থতার দায় আমরা নেব না। এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকেই জবাবদিহি করতে হবে, কৈফিয়ত দিতে হবে। মহাজোটকে বিব্রত না করে এঁদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত। তা না হলে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দ্রুত ব্যবস্থা চাই।’
মহাজোটের নেতারা জানান, বাণিজ্যমন্ত্রীর ব্যর্থতা ও অদক্ষতায় মজুদদারি ও অতি মুনাফাখোরি চক্রের কাছে সরকার পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছে। ফলে দ্রব্যমূল্য বেড়েই চলছে। ‘ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গড়ে তোলার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকলেও গত আড়াই বছরেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।
বাজার-ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা ও তদারকির অভাব, অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা, বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করতে না পারা এবং সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণ বলে মনে করে মহাজোট ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়। পাশাপাশি পরিবহনে চাঁদাবাজি, টিসিবিকে শক্তিশালী করতে না পারায় বাজার নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় বাণিজ্যমন্ত্রী জনগণকে কম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়ায় সব মহলে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
সারা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পুলিশের উপস্থিতিতে গণপিটুনিতে নিরীহ মানুষ হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করা হচ্ছে। চাঁদাবাজি ও দখলবাজি নিয়ন্ত্রণেও পুলিশ সফলতা পায়নি।
মহাজোটের নেতারা মনে করেন, পুলিশের ওপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি কম থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।
সম্প্রতি পুলিশের উপস্থিতিতে রাজধানীতে ছয় ছাত্র হত্যার ঘটনা সমাজে আতঙ্কের জন্ম দিয়েছে। নোয়াখালীতে পুলিশ মিলন নামের এক তরুণকে গাড়ি থেকে নামিয়ে জনতার হাতে তুলে দেয়। গণপিটুনিতে সে নিহত হলে পুলিশ আবার গাড়িতে তুলে নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কাদেরকে অপরাধী বানাতে পুলিশ মিথ্যা গল্প সাজিয়েছে। র‌্যাবের গুলিতে লিমনের পঙ্গু হওয়ার ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের নেতারা মনে করেন, এসব ঘটনা জনগণ ভালোভাবে নেয়নি।
এ ব্যাপারে জাতীয় পার্টির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা অযোগ্য, ব্যর্থ ও অকর্মণ্য মন্ত্রীদের দায়ভার নেব না। এদের বিদায় দেওয়া না হলে মহাজোট বিপর্যয়ে পড়বে।’
১৪ দলের শরিক কমিউনিস্ট কেন্দ্রের যুগ্ম আহ্বায়ক অসিত বরণ বিশ্বাস বলেন, বাণিজ্যমন্ত্রী যেদিন কথা বলেন, সেদিনই জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। ১৪ দলের ২৩ দফায় আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের কথা বলা ছিল। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি নেই। কাজেই অযোগ্য মন্ত্রীদের দায়ভার ১৪ দল নেবে না।
মহাজোটের শরিক ও নিজের দলের নেতাদের দাবির মুখে পদত্যাগ করবেন কি না, জানতে চাইলে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা করতে হলে আগে আমাকে ভাবতে হবে। যাঁরা আমাকে ভোট দিয়েছেন, আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষ কী মনে করেন। পাশাপাশি আমার নিয়োগকর্তা কী বলেন।’
আপনার নিজের বিবেচনায় কী মনে হয়, পদত্যাগ করা উচিত? মন্ত্রী বলেন, ‘আমার ত্রুটির কারণে এ সমস্যা দেখা দেয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বরাদ্দ কম থাকার কারণে রাস্তাঘাটের এ অবস্থা হয়েছে।’
দেশের রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কথা শুধু যে এখন বলা হচ্ছে, তা নয়। গত ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে এ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়। সেদিন আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সাংসদ এ প্রসঙ্গ তুলে বলেছিলেন, গত আড়াই বছরে দেশের কোথাও সড়কের উন্নয়নে কাজ হয়নি। রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। এরপর রাশেদ খান মেননও সংসদে এ প্রসঙ্গ নিয়ে বক্তব্য দেন। কিন্তু যোগাযোগমন্ত্রী বা সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

পুলিশের অভিযোগপত্রে আসামি শুধুই পরিমল

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বসুন্ধরা শাখার দশম শ্রেণীর ছাত্রী ধর্ষণ মামলায় অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। এতে চাকরিচ্যুত শিক্ষক পরিমল জয়ধরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম এবং বসুন্ধরা শাখার ভারপ্রাপ্ত শাখাপ্রধান লুৎফর রহমানকে অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবারের সদস্যরা পুলিশের অভিযোগপত্র প্রত্যাখ্যান করে প্রথম আলোকে জানান, পুলিশ প্রভাবিত হয়ে মামলা তদন্ত করে অধ্যক্ষসহ দুই শিক্ষককে অভিযোগ থেকে বাদ দিয়েছে। তাঁরা এ অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি দেবেন বলেও জানান।
জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বাড্ডা থানার পরিদর্শক এস এম শাহাদত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ১১ আগস্ট মামলার অভিযোগপত্র তৈরি করা হয় এবং তা ১৪ আগস্ট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম ও বসুন্ধরা শাখার প্রধান লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তাই তাঁদের অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, ধর্ষণের শিকার ছাত্রীটি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত ভাড়া বাসার কোচিং সেন্টারের একটি কক্ষে আটকে রেখে পরিমল জয়ধর তাকে দুই দফা ধর্ষণ করেছেন। গত ১১ জুলাই পরিমল জয়ধর মেয়েটিকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। মেয়েটির ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, আদালতে দেওয়া মেয়েটির জবানবন্দি ও আসামি পরিমলের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পর্যালোচনা এবং সার্বিক তদন্তে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামি পরিমল জয়ধরের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ সংশোধিত ২০০৩ এর ৯(১) ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
অধ্যক্ষ হোসনে আরা বেগম ও শাখাপ্রধান লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধে আলামত বিনষ্ট করা, ভয়ভীতি দেখানো ও মেয়েটিকে স্কুল থেকে বহিষ্কারের হুমকির অভিযোগে মামলা করার পর ওই দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হয়। এ ঘটনায় ৩৫ জনের সাক্ষ্য নেওয়া হয়। তদন্তে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এ জন্য তাঁদের অব্যাহতির জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রের ব্যাপারে জানতে চাইলে ধর্ষণের শিকার মেয়েটির পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, অধ্যক্ষ মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছিলেন। মেয়েটির স্বজনদের বক্তব্য অভিযোগপত্রে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলেও মেয়েটির স্বজনেরা অভিযোগ করেন।
এ ব্যাপারে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত থেকে তিনি এ মামলার নিরপেক্ষ তদন্ত করেছেন।
গত ৭ জুলাই ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ পরিমল জয়ধরকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ১১ জুলাই তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। ভিকারুননিসা কর্তৃপক্ষ পরিমলকে চাকরিচ্যুত করে। তবে এ ঘটনার পর অধ্যক্ষ হোসনে আরার অপসারণের দাবিতে ভিকারুননিসার ছাত্রী ও অভিভাবকেরা আন্দোলন শুরু করেন। এ অবস্থায় হোসনে আরাকে তিন মাসের ছুটি দিয়ে মঞ্জুআরা বেগমকে অধ্যক্ষের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদন: ছাত্রী ধর্ষণ ও পরবর্তী সময়ে সৃষ্ট ঘটনার জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দায়ী করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ফাহিমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, কাল রোববার প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রতিবেদনে এই ঘটনায় সৃষ্ট পরিস্থিতির জন্য অধ্যক্ষ হোসনে আরাসহ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে দায়ী করা হয়েছে। কমিটি মনে করে, কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেরি করেছে। এরপর পরিচালনা কমিটির কয়েকজন সদস্যের কার্যকলাপ দেখে মনে হয়েছে তাঁরা ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চেয়েছেন। তাঁদের সঙ্গে কিছু শিক্ষকও দায়ী। ২৪ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে এত বেশি শাখা না খোলা, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিশেষ ধরনের কমিটি করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির প্রধান ছিলেন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক এস এম ওয়াহিদুজ্জামান।